মেয়ে হতেই খুন করে খালে নিক্ষেপ! মা-বাবাকে যাবজ্জীবন আদালতের

কলকাতায় মার্কিন বিদেশ সচিবের মেগা সফর কিংবা বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-বিজিবি-র ‘অ্যাকশন মুড’-এর খবরের মাঝেই, হুগলি জেলা থেকে এক শিউরে ওঠা অপরাধের ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দিল আদালত। তিন-তিনটি কন্যাসন্তানের পর চতুর্থবারও মেয়ে হওয়ায় খোদ জন্মদাত্রী মা ও জন্মদাতা বাবা মিলে শ্বাসরোধ করে খুন করল সদ্যোজাতকে। এরপর প্রমাণ লোপাটের জন্য শিশুটির দেহ নাইলনের ব্যাগে ভরে ফেলে দেওয়া হয় স্থানীয় একটি খালে। ২০২০ সালের এই হাড়হিম করা ঘটনার দীর্ঘ ৬ বছর পর অবশেষে দোষী মা-বাবাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কঠিন শাস্তি শোনাল চুঁচুড়া আদালত। মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিল আধুনিক বিজ্ঞানের ডিএনএ (DNA) পরীক্ষা।
জন্মের দিনই নৃশংস হত্যাকাণ্ড, থানায় অভিযোগ প্রতিবেশীর
আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর হুগলির পাণ্ডুয়া থানার অন্তর্গত মানুষমারি গ্রামের বাসিন্দা পূর্ণিমা টুডু তাঁর চতুর্থ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। অভিযোগ, পর পর মেয়ে হওয়ায় চরম ক্ষোভে ও আক্রোশে ওই দিনই স্বামী নারায়ণ টুডুর সঙ্গে মিলে সদ্যোজাত শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে খুন করেন পূর্ণিমা। এরপর লোকচক্ষুর আড়ালে শিশুটির নিথর দেহ একটি নাইলনের ব্যাগে পুরে বাড়ির কাছের খালে ফেলে দেওয়া হয়।
এই নৃশংস ঘটনার কথা জানাজানি হতেই এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায়। পাণ্ডুয়া থানায় দম্পতির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তাঁদের প্রতিবেশী গণেশ মুর্মু। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তৎকালীন পাণ্ডুয়া থানার পুলিশ অফিসার বুদ্ধদেব সরকার ঘটনার তদন্তে নামেন এবং অভিযুক্ত মা-বাবাকে গ্রেফতার করা হয়।
সন্তানকে অস্বীকার মা-বাবা’র, মোড় ঘোরাল ডিএনএ পরীক্ষা
বৃহস্পতিবার চুঁচুড়া আদালতে এই মামলার রায় ঘোষণার পর হুগলি জেলার মুখ্য সরকারি আইনজীবী শঙ্কর গঙ্গোপাধ্যায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনেন। তিনি জানান, খাল থেকে সদ্যোজাতর পচনশীল দেহ উদ্ধার হওয়ার পর অভিযুক্ত মা-বাবা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে দাবি করেছিলেন যে ওই সন্তান তাঁদের নয়। তাঁরা পুরোপুরি দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।
আইনজীবী বলেন:
“এই মামলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং বৈজ্ঞানিক দিকটি হলো, অভিযুক্তরা নিজেদের সন্তান বলে মানতে অস্বীকার করায় আদালতের নির্দেশে ডিএনএ (DNA) পরীক্ষা করানো হয়। ল্যাবরেটরি থেকে ডিএনএ রিপোর্ট আসার পর দেখা যায় সদ্যোজাতর ডিএনএ-র সঙ্গে ধৃত মা-বাবার ডিএনএ হুবহু মিলে গেছে। বিজ্ঞানের এই অকাট্য প্রমাণের সামনে আসামিদের সমস্ত মিথ্যে অজুহাত ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়।”
১৭ জনের সাক্ষ্য, বিচারক কৌস্তভ মুখোপাধ্যায়ের কড়া রায়
পাণ্ডুয়া থানায় দায়ের হওয়া এফআইআর-এর পর পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চার্জশিট গঠন করে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় মোট ১৭ জন সাক্ষীর বয়ান ও ডিএনএ রিপোর্টের ভিত্তিতে গতকাল চুঁচুড়ার তৃতীয় দায়রা আদালতের বিচারক কৌস্তভ মুখোপাধ্যায় আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করেন।
বৃহস্পতিবার আদালত তার চূড়ান্ত রায়ে অপরাধী দম্পতিকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় (খুন) যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে ১০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা এবং তা অনাদায়ে আরও অতিরিক্ত ৬ মাসের জেল হেফাজতের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী ও সমাজকর্মীদের মতে, একদিকে যখন নতুন সরকারের জমানায় রাজ্যে নারী নিরাপত্তা ও সুশাসন নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে, ঠিক অন্যদিকে কন্যাসন্তান হওয়ার অপরাধে মা-বাবার এই চরম নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আদালতের এই দৃষ্টান্তমূলক রায় সমাজে এক কড়া বার্তা দিল। কন্যাসন্তানদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং এই ধরণের মধ্যযুগীয় মানসিকতা উপড়ে ফেলতে বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার ও আইনের এই কঠোর অবস্থান অত্যন্ত জরুরি ছিল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।