‘বার্তাবাহকের কণ্ঠরোধ কোরো না’! সিজেপি-র সমর্থনে নিজেকে ‘সম্মানীয় আরশোলা’ বললেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক

‘বার্তাবাহকের কণ্ঠরোধ কোরো না’! সিজেপি-র সমর্থনে নিজেকে ‘সম্মানীয় আরশোলা’ বললেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক

রাজ্যে নতুন সরকারের কর্মসংস্থান নীতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া বার্তা, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদী কবিতা ‘দখল’ এবং কুণাল ঘোষের ‘কচ্ছপ পোস্ট’ ঘিরে তোলপাড়ের মাঝেই, দেশের জাতীয় রাজনীতিতে এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন যুব আন্দোলনের জলঘোলা শুরু হলো। নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া ব্যঙ্গাত্মক যুব আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) বা সিজেপি-র পাশে দাঁড়িয়ে এক মস্ত বড় মেগা বার্তা দিলেন দেশের প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ও শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক। যুবসমাজের এই ডিজিটাল অভিনব প্রতিবাদকে সমর্থন জানিয়ে তিনি নিজেকে একটি লাইটার নোটে ‘সম্মানীয় আরশোলা’ (Honorary Cockroach) বলে উল্লেখ করেছেন।

দেশজুড়ে বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং সরকারি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে তৈরি হওয়া এই যুব আন্দোলনকে সরকারের কোনো ‘বিপদ’ বা ‘হুমকি’ হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ওয়াংচুক। তাঁর মতে, এটিকে সম্পূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক ভিন্নমতের শৈল্পিক রূপ হিসেবেই গ্রহণ করা দরকার।

ডিজিটাল সৃজনশীলতায় মুগ্ধ ওয়াংচুক, দিলেন ‘কার্টুনিস্ট’ উদাহরণ

জাতীয় সংবাদসংস্থা পিটিআই (PTI)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাদাখের এই লড়াকু সমাজকর্মী সিজেপি-র প্রচার অভিযান এবং যুবকদের রসাত্মক প্রতিবাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আমি দেশের তরুণদের এই ধরনের সৃজনশীল অভিব্যক্তিতে অত্যন্ত মুগ্ধ। এতে দুশ্চিন্তা বা ভয়ের কিছু নেই। আমাদের দেশের যুবকেরা অন্য দেশের মতো হিংসার পথে হেঁটে রাস্তায় পাথর ছুড়ছে না, বরং ব্যঙ্গ ও মিম কালচারের (Meme Culture) মাধ্যমে নিজেদের মনের ফ্রাস্ট্রেশন বা ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। এটা তো ভারতকে বিশ্বমঞ্চে ‘বিশ্বগুরু’ প্রমাণ করার মতো একটি চমৎকার শিল্পসম্মত পদ্ধতি।”

সংবাদপত্রে প্রকাশিত রাজনৈতিক কার্টুনের সাথে এই আন্দোলনের তুলনা টেনে ওয়াংচুক এক কড়া বার্তা দেন:

“সংবাদপত্রের কার্টুনিস্টরা যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন, তখন তো আমরা তাঁদের ওপর গুলি চালিয়ে দিই না। এটাকেও ঠিক তেমনই এক গণতান্ত্রিক ফিডব্যাক (Feedback) হিসেবে দেখা উচিত। সরকারের উচিত বার্তাটি গ্রহণ করা এবং বার্তাবাহকের কণ্ঠরোধ না করা। কারণ বার্তাবাহককে শেষ করে দিলে বার্তা কোনোদিন শেষ হয় না।”

‘বেকার বা অলস নই, তাই আমি সম্মানীয় আরশোলা’

সিজেপি-র সদস্য হওয়া প্রসঙ্গে সোনম ওয়াংচুক বেশ মজার ছলে এক গভীর সামাজিক সত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “অনেকেই আমাকে এই সিজেপি বা ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য হওয়ার জন্য বলছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি এই দলের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারছি না। কারণ আমি তো বেকার বা অলস নই। তবে আমি নিজেকে একজন গর্বিত ও সম্মানীয় আরশোলা হিসেবে মনে করি, যে এই তরুণদের মূল ভাবনার সাথে সম্পূর্ণ একমত।”

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আরশোলা বা ককরোচ এমন এক পতঙ্গ যা যেকোনো কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিঁকে থাকতে বা সারভাইভ করতে পারে। ভারতীয় যুবসমাজ নিজেদের এই চরম সহনশীলতাকে বোঝাতেই আরশোলাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছে।

ডিজিটাল কণ্ঠরোধ নিয়ে নেপাল মডেলের সতর্কবার্তা

বিগত কয়েকদিনে সিজেপি-র এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল ব্লক করা এবং তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটটি হঠাৎ ইন্টারনেট থেকে উধাও বা ডাউন হয়ে যাওয়ার পর থেকেই নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের অভিযোগ তুলছিলেন আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। প্রায় ১০ লক্ষ তরুণ এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে ওয়াংচুক সরকারকে এক মস্ত বড় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি প্রতিবেশী দেশ নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার উদাহরণ টেনে বলেন, “আমি শুনছি সোশ্যাল মিডিয়ায় এই যুবকদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। যুবসমাজকে এভাবে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেবেন না। নেপালে যখনই ইন্টারনেট বন্ধ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্বাধীন মতামতকে জোর করে চেপে দেওয়া হয়েছিল, তখনই ক্ষুব্ধ যুবকেরা রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত কুৎসিত আকার ধারণ করেছিল। ডিজিটাল স্পেস কেড়ে নিলে এই ক্ষোভ যেকোনো দিকে ঘুরে যেতে পারে।”

একদিকে যখন ১ জুন থেকে রাজ্যে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ চালু করতে এবং মহিলাদের বিনামূল্যে বাস সফরের প্রস্তুতিতে প্রশাসন ব্যস্ত, ঠিক অন্যদিকে জাতীয় স্তরে ১০ লক্ষ তরুণের এই ‘আরশোলা আন্দোলন’ এবং তার সমর্থনে খোদ সোনম ওয়াংচুকের মতো ব্যক্তিত্বের এই কড়া অবস্থান ছাব্বিশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আবহে এক নতুন মেগা আলোড়ন সৃষ্টি করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *