এবার রোগী কল্যাণ সমিতি নিয়ে সংঘাত! কুণাল ঘোষের পদ পাওয়া নিয়ে রাজ্য ও বিরোধীদের মধ্যে অদ্ভুত মেগা বিড়ম্বনা

তৃণমূলের অন্দরে কুণাল ঘোষের ‘কচ্ছপ পোস্ট’ ঘিরে তোলপাড় এবং নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মেগা সংবর্ধনা সভার মাঝেই, রাজ্যের স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক অলিন্দে এক অদ্ভুত আইনি বিড়ম্বনা ও রাজনৈতিক চাপানউতোর সামনে এল। বিসি রায় শিশু হাসপাতালের (BC Roy Children’s Hospital) রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য পদ নিয়ে এবার সরাসরি সংঘাত বাধল রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার এবং বিদায়ী শাসকদলের হেভিওয়েট বিধায়ক কুণাল ঘোষের মধ্যে। কুণাল ঘোষকে এই পদ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে খোদ রাজ্য সরকারের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং স্বয়ং কুণাল ঘোষের বয়ানে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরু তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে নবান্নে।
বিগত বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইনের ব্যর্থতা এবং বরাহনগরে তৃণমূল নেতার গ্রেফতারির ডামাডোলের সমান্তরালে, কলকাতার এক প্রথম সারির হাসপাতালের প্রশাসনিক কমিটির রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে এই নতুন তরজা ছাব্বিশের সুশাসনে এক মস্ত বড় আইনি লড়াইয়ের রূপ নিতে চলেছে।
“কুণালবাবুর সদস্য হওয়ার কোনো তথ্যই নেই”, মেগা দাবি মন্ত্রী অগ্নিমিত্রার
প্রশাসনিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার আচমকাই খবর চাউর হয় যে, ফুলবাগানের বিখ্যাত বিসি রায় শিশু হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির (Rogi Kalyan Samity) নতুন সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষকে। রাজ্যের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মাঝে একজন হেভিওয়েট বিরোধী বিধায়কের এই গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হতেই ময়দানে নামেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, কুণাল ঘোষকে এই হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য করা হচ্ছে— এমন কোনো সরকারি তথ্য বা নথিপত্র রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য বা শিশুকল্যাণ দফতরের কাছে আপাতত নেই। স্বাভাবিকভাবেই মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর রাজ্য জুড়ে শোরগোল পড়ে যায় যে, তবে কি এই নিয়োগের কোনো আইনি ভিত্তি নেই?
“আমার কাছে হার্ড কপি রয়েছে”, পাল্টা চ্যালেঞ্জ কুণাল ঘোষের
মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের এই কড়া দাবির পরই নিজের এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল ও সংবাদমাধ্যমের সামনে নথিপত্র নিয়ে পাল্টা হুঙ্কার ছেড়েছেন বিরোধী বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর দাবি, এই সদস্য পদের বিষয়ে কোনো হাওয়ায় কথা হচ্ছে না, বরং রাজ্য সরকারের নির্দেশিকা সম্বলিত আসল ‘হার্ড কপি’ (Hard Copy) এই মুহূর্তে তাঁর নিজের কাছে রয়েছে।
অগ্নিমিত্রা পালকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে কুণাল ঘোষ জানান:
- বিজ্ঞপ্তির বাধ্যবাধকতা: যে সরকারি বিজ্ঞপ্তির (Notification) মাধ্যমে তাঁকে বিসি রায় শিশু হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ আইনি ও নিয়মতান্ত্রিক।
- সিদ্ধান্ত বদলের আইনি জট: নতুন সরকার যদি এখন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারণে সিদ্ধান্ত বদলাতে চায়, তবে আগেরটি বাতিল করে নতুন করে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে। কোনো মন্ত্রীর মৌখিক দাবিতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া খণ্ডন করা যাবে না।
প্রশাসনিক সমীকরণ ও ছাব্বিশের শুদ্ধিকরণ
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রতিটি সরকারি ও স্বশাসিত হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতি থেকে পুরোনো জমানার বিদায়ী শাসকদলের নেতাদের সরিয়ে নতুন মুখের মেগা রদবদল করতে চাইছে নবান্ন। ইতিমধ্যেই আরজি কর কাণ্ড এবং অন্যান্য হাসপাতালে থার্ড পার্টি ভেন্ডরদের দুর্নীতি রুখতে যখন চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ‘ম্যানপাওয়ার অডিট’ শুরু হয়েছে, ঠিক সেই আবহে বিসি রায় হাসপাতালের এই ‘কুণাল-জট’ নবান্নের আমলাদের জন্য মস্ত বড় অস্বস্তি তৈরি করল।
একদিকে যখন রাজারহাটের মুসলিম পাড়ায় ৯৭ শতাংশ বিজেপি ভোট পড়া নিয়ে ইভিএম বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়ানোর ইঙ্গিত মিলছে এবং অন্যদিকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা ‘দখল’ লিখেছেন— সেই অলআউট রাজনৈতিক যুদ্ধের সমান্তরালে বিসি রায় হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির এই সদস্য পদ বিতর্ক আগামী দিনে কোন আইনি মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে ওয়াকিবহাল মহলের।