ব্রাজিলের নিজস্ব ‘মেসি’ খোঁজার অন্তহীন তাড়না আর কার্লো অ্যান্সেলোত্তির এক ঝুঁকিপূর্ণ ফাটকা

ব্রাজিলের নিজস্ব ‘মেসি’ খোঁজার অন্তহীন তাড়না আর কার্লো অ্যান্সেলোত্তির এক ঝুঁকিপূর্ণ ফাটকা

বিশ্ব ফুটবলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সমকক্ষ একজন তারকাকে নিজেদের শিবিরে দাঁড় করাতে দীর্ঘদিন ধরে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ব্রাজিল। ২০১০ বিশ্বকাপের পর মাত্র আঠারো বছর বয়সে যখন নেইমার জুনিয়র জাতীয় দলে আসেন, তখন আপামর ব্রাজিলবাসী তাঁর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিল সেই কাঙ্ক্ষিত নায়ককে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দেশের হয়ে বড় খেতাব জেতানোর সেই বিশাল প্রত্যাশার চাপ বইতে বইতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন এই তারকা। এবার আরও একটি বিশ্বকাপের মঞ্চে ৩৪ বছর বয়সী নেইমারকে দলে রেখে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন সেলেসাওদের অভিজ্ঞ কোচ কার্লো অ্যান্সেলোত্তি। ফর্মহীনতা আর চোটের জর্জর ইতিহাস থাকার পরও নেইমারের অন্তর্ভুক্তিকে অনেকে স্রেফ আবেগের বশে নেওয়া এক বড় ফাটকা হিসেবে দেখছেন।

পরিসংখ্যানের দৈন্য বনাম অতিতৃপ্তি

পরিসংখ্যানের বিচারে নেইমারের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স একেবারেই আশাব্যঞ্জক নয়। গত তিন বছরে তিনি মাত্র ২৭টি লিগ ম্যাচ শুরু করতে পেরেছেন এবং চলতি মরসুমে মাঠে ছিলেন মাত্র ৬৮২ মিনিট। বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তেও তিনি নতুন করে কাফের চোটে পড়েছেন। এর বিপরীতে, ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের আগে ৩৫ বছর বয়সী মেসি ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে, যেখানে তিনি ১৮টি ম্যাচে ১০টি গোল করেছিলেন। অথচ ফর্মের তুঙ্গে থাকা জোয়াল পেদ্রোর মতো তরুণ স্ট্রাইকারকে বাদ দিয়ে অ্যান্সেলোত্তি যখন নেইমারকে বেছে নেন, তখন এটি মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে অতীতের নস্টালজিয়া ও দুর্মর আশাকে জিইয়ে রাখার কৌশল বলেই প্রতীয়মান হয়। বিশ্লেষকদের মতে, চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের অন্যতম সফল এই কোচ হয়তো ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রত্যাশার বিশাল চাপ ও ভাঙা স্বপ্নের খতিয়ান

নেইমারের ফুটবল ক্যারিয়ার আসলে অপার সম্ভাবনা আর সীমাহীন প্রত্যাশার মাঝে আটকে থাকার এক ট্র্যাজিক গল্প। ২০১৫ সালে বার্সেলোনায় মেসি ও সুয়ারেজের সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর, ২০১৭ সালে মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের একক সাম্রাজ্য গড়তে ও ব্যালন ডি’অর জয়ের স্বপ্নে পিএসজিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্যারিসের সেই অধ্যায় তাঁকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে পারেনি। পরবর্তীতে মেসি পিএসজিতে যোগ দিয়ে এবং আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল ঈশ্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও নেইমার থেকে গেছেন রিক্ত ও শূন্য হাতে।

২০১৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে ব্রাজিলের পরাজয় ছিল নেইমার-কেন্দ্রিক কৌশলের ব্যর্থতার এক বড় উদাহরণ, যেখানে প্রতিপক্ষ কোচ নেইমারের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পুরো ব্রাজিল দলকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিলেন। বর্তমান দলেও নেইমারকে রাখা দলের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বোদ্ধারা। নব্বই মিনিট মাঠে লড়াই করার শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলা নেইমার হয়তো বেঞ্চ থেকে নেমে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কিছু ঝলক দেখাতে পারেন, কিন্তু তাঁর ওপর ভর করে হেক্সা মিশনের স্বপ্ন পূরণ করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বড় সংশয় রয়েছে। ব্রাজিলের ফুটবল নস্টালজিয়ার ওপর ভর করে অ্যান্সেলোত্তির নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপে দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিশাল প্রভাব ফেলবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *