ফলতায় মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে বামেরা, তৃণমূলের দুর্গে বড়সড় ভাঙনের ইঙ্গিত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একসময়ের অপরাজেয় মিথ হিসেবে পরিচিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ বড়সড় ধাক্কা খেল ফলতা বিধানসভার নির্বাচনী ফলাফলে। পুনর্নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জাহাঙ্গির খান ময়দান থেকে সরে দাঁড়ানোয় এই কেন্দ্রে বিজেপির জয় কার্যত সময়ের অপেক্ষা ছিল। তবে রাজনৈতিক মহলকে সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে সিপিএমের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। ২৫ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে এই কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বামেরা, যেখানে বর্তমান শাসকদল তৃণমূল নেমে গেছে চতুর্থ স্থানে।
দশ রাউন্ড গণনা শেষে নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজেপির আইনজীবী প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডা ৬৪,২৩৮ ভোট পেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু নজর কেড়েছে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুড়মির ২৫,২৯৮টি ভোট। অন্যদিকে কংগ্রেসের আব্দুল রেজ্জাক মোল্লা পেয়েছেন ৬,৪২৯ ভোট এবং ময়দান ছাড়া তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের ঝুলিতে পড়েছে মাত্র ৩,৩০৪টি ভোট। ২১ রাউন্ড গণনার এই লড়াইয়ে বিজেপির জয় স্পষ্ট হলেও, বামেদের এই উত্থান দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।
নেতৃত্বের দূরত্ব ও সাংগঠনিক অবক্ষয়
ফলতার এই বিপর্যয়ের পেছনে শাসকদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশলগত দূরত্বকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ভোটের শেষলগ্নে প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের ওপর থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের হাত সরে যাওয়া এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতার প্রচার থেকে দূরে থাকা তৃণমূল কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। ফলে নেতৃত্বহীন তৃণমূল কর্মীদের একাংশ এবং প্রথাগত শাসক-বিরোধী ভোট সরাসরি বামেদের ঝুলিতে চলে যায়। আর এই ফাঁকা মাঠের সুযোগকে সুনিপুণভাবে কাজে লাগিয়েছে আলিমুদ্দিন।
বামপন্থার পুনরুত্থান ও ভবিষ্যতের প্রভাব
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ‘শূন্য’ হয়ে যাওয়া বামেরা ২০২৬ সালের নির্বাচনে ডোমকলে জয়ের পর থেকেই খরা কাটাতে শুরু করেছিল। ফলতার এই ফলাফল প্রমাণ করছে যে ডোমকল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বিজেপির বিপুল ভোটের ব্যবধানের তুলনায় সিপিএমের ভোট কম হলেও, তৃণমূল ও কংগ্রেসকে বহু পিছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দুর্নীতি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত শাসকদল যখন জনমানসে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে, তখন মেরুকরণের রাজনীতির বাইরে থাকা এক শ্রেণির ভোটার আবারও পুরনো বামপন্থার দিকেই আস্থা ফেরাতে চাইছেন। ফলতার এই সমীকরণ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, রাজ্যে তৃণমূলের ক্ষমতার দাপট যেখানেই কমছে বা দল যেখানেই দুর্বল হচ্ছে, সেখানেই প্রধান বিকল্প ও দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে বামেরা।