চিন ও পাকিস্তানের ঘুম ওড়াতে ভারতীয় সেনার হাতে ‘কাল ভৈরব’, পর্তুগালে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ঘাতক ড্রোন

চিন ও পাকিস্তানের ঘুম ওড়াতে ভারতীয় সেনার হাতে ‘কাল ভৈরব’, পর্তুগালে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ঘাতক ড্রোন

প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিশ্বমঞ্চে এক অভাবনীয় পদক্ষেপ নিতে চলেছে ভারত। ভারতীয় সেনার শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে এবার যুক্ত হতে চলেছে কৃত্রিম মেধাভিত্তিক (এআই) অত্যাধুনিক ঘাতক ড্রোন ‘কাল ভৈরব’। তবে সবচেয়ে বড় চমক হল, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই পাইলটবিহীন যুদ্ধবিমানের বাণিজ্যিক উৎপাদন ভারতের মাটিতে নয়, বরং হতে চলেছে ইউরোপের দেশ পর্তুগালে। বেঙ্গালুরুর বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস’ (এফডব্লিউডিএ) এবং পর্তুগালের লিসবনের বিখ্যাত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণকারী সংস্থা ‘স্কেচপিক্সেল এলডিএ’-র যৌথ উদ্যোগে এই কাজ শুরু হচ্ছে। ভারতের সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের ইতিহাসে দেশের বাইরে উৎপাদনের এমন বড় সিদ্ধান্ত এই প্রথম, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।

কেন উৎপাদনের জন্য বেছে নেওয়া হল পর্তুগাল

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন উৎপাদনের জন্য পর্তুগালকে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে ভারতের সুদূরপ্রসারী কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। পর্তুগাল মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নেটো’র (ন্যাটো) সদস্য। এই জোটের দেশগুলি নিজেদের মধ্যে অত্যন্ত উন্নত সামরিক প্রযুক্তি আদান-প্রদান করে থাকে। পর্তুগালের সংস্থা ‘স্কেচপিক্সেল’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত লকহিড মার্টিনের চতুর্থ প্রজন্মের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ তৈরি করে থাকে। ফলে এই যৌথতার মাধ্যমে ভারত পর্তুগালের স্টিমুলেশন সিস্টেম, এআই যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তঃকার্যক্ষমতার কারিগরি সহায়তা পাবে, যা ভারতের নেটো বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশাধিকার সহজ করবে।

দ্বিতীয়ত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের মতো দেশগুলোকে সামনে রেখে ইউরোপের বাজারে নিজেদের তৈরি অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রি করতে চায় নয়াদিল্লি, যার লক্ষ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এছাড়া, বেঙ্গালুরুর সংস্থায় মূলত গবেষণার কাজ হওয়ায় সেনার বিপুল বরাত নির্দিষ্ট সময়ে পূরণ করতেই লিসবনের সংস্থার সঙ্গে এই চুক্তি। পাশাপাশি সাবেক সেনাকর্তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধের সময় দেশের ভেতরের কারখানাগুলি চিন বা পাকিস্তানের নিশানায় আসতে পারে। পর্তুগালে উৎপাদন হলে সেই ঝুঁকি এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে যাবে।

‘কাল ভৈরব’-এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

‘কাল ভৈরব’ মূলত মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘক্ষণ উড়তে সক্ষম (এমএএলই) একটি ড্রোন। এর উড্ডয়ন ক্ষমতা এবং নিখুঁত নিশানা চিনের পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট।

  • পাল্লা ও স্থায়িত্ব: এই ড্রোনটি একটানা ৩০ ঘণ্টা আকাশে ভেসে থাকতে পারে এবং এর কার্যক্ষমতার পরিধি প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার।
  • বিস্ফোরক বহন: এটি প্রায় পাঁচ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক নিয়ে সরাসরি শত্রুর ওপর আঘাত হানতে পারে।
  • এআই বা কৃত্রিম মেধা: এই ড্রোনের আসল শক্তি এর বুদ্ধিমত্তা। ঝাঁক বেঁধে বা ‘সোয়ার্ম’ হামলা চালানোর সময় ড্রোনগুলি কৃত্রিম মেধার সাহায্যে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। শত্রুর রাডার, এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা, জ্বালানি এবং অস্ত্রের ডিপো নিজে থেকেই খুঁজে বের করে ধ্বংস করার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে এর।

বিশ্বমঞ্চে ভারতের ‘অপারেশন ৭৭৭’

‘ফ্লাইং ওয়েজ় ডিফেন্স’-এর সিইও সুহাস তেজ়স্কন্দ জানিয়েছেন, সামরিক প্রযুক্তিতে ভারতের অগ্রগতির প্রমাণ দিতেই ‘কাল ভৈরব’কে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ‘অপারেশন ৭৭৭’-এর আওতায় বিশ্বের ৭টি মহাদেশের ৭৭টি দেশে এই ড্রোনের উৎপাদন, উন্নত সংস্করণ তৈরি এবং মোতায়েনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে, যা বিশ্ব বাজারে ভারতীয় অস্ত্রের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’ যুদ্ধে পাকিস্তানের ড্রোন হামলা নস্যাৎ করার পর থেকেই ভারত ড্রোন প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। সম্প্রতি সফল পরীক্ষা চালানো ১,০০০ কিলোমিটার পাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন ‘শেষনাগ-১৫০’ এবং এবার পর্তুগালের হাত ধরে ‘কাল ভৈরব’-এর বৈশ্বিক আত্মপ্রকাশ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আধুনিক যুদ্ধকৌশলে প্রতিবেশীদের টেক্কা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত ভারতীয় সেনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *