৩০ বছরে দ্বিগুণ মানসিক রোগী, নিঃশব্দ মহামারির কবলে বিশ্ব!

বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এখন এক মারাত্মক নিঃশব্দ মহামারির রূপ নিয়েছে। বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান পত্রিকা ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত ‘গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ স্টাডি ২০২৩’ প্রকল্পের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনও না কোনও মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন, যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রতি ৭ জনে ১ জন। গত তিন দশকে এই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৫.৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন আর শুধু সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং বিশ্বের অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য এক বড়সড় হুমকি।
উদ্বেগ-অবসাদের গ্রাসে তরুণ প্রজন্ম ও মহিলারা
গবেষণায় স্পষ্ট যে, দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ (অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার) এবং তীব্র অবসাদই (মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার) মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করছে। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং সামাজিক সম্পর্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই মানসিক সমস্যার হার সবচেয়ে বেশি। পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব, একাকীত্ব এবং পারিবারিক অশান্তি তরুণ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি, লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে পুরুষদের তুলনায় মহিলারা এই সংকটের বেশি শিকার। ২০২৩ সালে যেখানে ৫৫ কোটির বেশি পুরুষ আক্রান্ত ছিলেন, সেখানে মহিলাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬২ কোটি। পারিবারিক ও সামাজিক চাপ এবং কর্মক্ষেত্রের বৈষম্যকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভারতের জন্য সতর্কবার্তা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই আন্তর্জাতিক রিপোর্ট ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশের জন্য এক বড় বিপদের ইঙ্গিত। ভারতের একটি বিশাল অংশ তরুণ প্রজন্ম, যারা এই মুহূর্তে মানসিক ঝুঁকির দিক থেকে সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তরে রয়েছে। দেশে উদ্বেগ ও অবসাদ ক্রমাগত বাড়লেও সামাজিক কুসংস্কার, লোকলজ্জার ভয়, দক্ষ চিকিৎসকের অভাব এবং গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসার অপর্যাপ্ততার কারণে বহু মানুষ এখনও সঠিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, মানসিক স্বাস্থ্যকে আর ‘গৌণ’ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতি, সামগ্রিক কর্মক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। এই সংকট মোকাবিলায় স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার করা, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং গ্রামীণ স্তরে সচেতনতা ও চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।