হাই-টেক ‘গুপ্তচর’ ট্রাইওন্ডা, ফুটবল বিশ্বকাপের বল নিজেই এবার ধরবে অফসাইড

ফুটবল এখন আর শুধু ২২ জন খেলোয়াড় এবং একটি সাধারণ চামড়ার বলের খেলা নয়। সময়ের সাথে সাথে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ফুটবল মাঠের সমীকরণ। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হতে চলেছে টুর্নামেন্টের অফিসিয়াল বল ‘ট্রাইওন্ডা’ (TRIONDA)। স্পোর্টস জায়ান্ট অ্যাডিডাস ও ফিফার তৈরি এই নতুন বলটি কেবল ফুটবলারদের কিকেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি কাজ করবে একটি অত্যাধুনিক ‘স্মার্ট ডিভাইস’ হিসেবে। বাইরে থেকে উত্তর আমেরিকার তিন আয়োজক দেশ—আমেরিকা, মেক্সিকো ও কানাডার রঙে রঙিন এই বলের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব।
বলের ভেতরে সেন্সর ও অফসাইডের নিখুঁত হিসাব
ট্রাইওন্ডা বলের মূল চমক রয়েছে এর অন্দরে। বলের ঠিক মাঝখানে বসানো হয়েছে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী মোশন সেন্সর চিপ। এই চিপটি ম্যাচ চলাকালীন প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য পাঠাতে সক্ষম। ফুটবলারের পায়ে বল কখন লাগল, কত গতিতে শট নেওয়া হলো কিংবা বলটি কোন দিকে ঘুরছে—সবকিছুই রিয়েল টাইমে রেকর্ড হবে। এই তথ্য সরাসরি পৌঁছে যাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) এবং সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেমে। এর ফলে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিতে রেফারিদের আর দীর্ঘক্ষণ রিপ্লে দেখার প্রয়োজন হবে না, বল নিজেই জানিয়ে দেবে নিখুঁত হিসাব। ভিএআর-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, এই চিপ প্রযুক্তির কারণে তা অনেকটাই কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাবুলানির শিক্ষা ও কোটি টাকার ডেটা ইকোনমি
অতীতে ২০১০ বিশ্বকাপের ‘জাবুলানি’ বলের অনিয়ন্ত্রিত গতিপথ নিয়ে খেলোয়াড় ও গোলকিপারদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ট্রাইওন্ডার ডিজাইনে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রচলিত ৩২টি প্যানেলের পরিবর্তে এই বলে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র চারটি বড় বাঁকানো প্যানেল। বাতাসে বলের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ভেজা আবহাওয়াতেও খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এতে যোগ করা হয়েছে বিশেষ গভীর খাঁজ ও টেক্সচার।
মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এই বলটি বিশ্ব ক্রীড়াবাজারে কোটি টাকার ‘ডেটা ইকোনমি’ বা তথ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চলেছে। ম্যাচ চলাকালীন বলের গতি, স্পিন এবং ট্র্যাজেক্টরি সম্পর্কিত যে বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি হবে, তা সম্প্রচার সংস্থা, ক্রীড়া বিশ্লেষক ও বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। লাইভ গ্রাফিক্স এবং তাত্ক্ষণিক পরিসংখ্যানের মাধ্যমে যা দর্শকদের খেলা দেখার অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে। মাঠের খেলাকে আরও নিখুঁত, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতেই এই হাই-টেক বলের আগমন ঘটছে।