ভাঙা মাটির চালা থেকে দেশের সেরা নিউরোলজিস্ট, রূপকথার জয়গাথা লিখলেন জঙ্গলমহলের অনুশ্রী!

পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের বলরামপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছালেন চিকিৎসক অনুশ্রী পাল। শৈশবের চরম প্রতিকূলতা এবং পরিকাঠামোহীনতাকে জয় করে তিনি নিউরোলজিতে প্রেসিডেন্টস গোল্ড মেডেল অর্জন করেছেন। ন্যাশনাল বোর্ড অফ এক্সামিনেশনস ইন মেডিক্যাল সায়েন্স পরিচালিত স্নাতকোত্তর চিকিৎসা পরীক্ষা ডিআরএনবি-তে সমগ্র দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছেন বাংলার এই কৃতী কন্যা। দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত ২৩তম সমাবর্তনে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নাড্ডা তাঁর হাতে এই অনন্য সম্মান তুলে দেন।
অভাব ও অশান্তির বিরুদ্ধে লড়াই
৩৫ বছর বয়সী অনুশ্রীর এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। বিদ্যুৎ ও শৌচাগারহীন এক জরাজীর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাটের বস্তায় বসে শুরু হয়েছিল তাঁর শিক্ষাজীবন। বর্ষার দিনে চাল চুইয়ে জল পড়লে বস্তা সরিয়ে পড়াশোনা করতে হতো তাঁকে। এর পাশাপাশি, তৎকালীন জঙ্গলমহলের মাওবাদী হিংসা, খুন ও নাশকতার আবহে এক চরম অশান্ত পরিবেশের মধ্যে বড় হতে হয়েছে তাঁকে। তবে বাবা অধ্যাপক অমৃতকুমার পাল এবং মা নিভা পালের সুযোগ্য পরিচালনায় কোনো গৃহশিক্ষক ছাড়াই মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যান অনুশ্রী। পরবর্তীতে পুরুলিয়া শহরের শান্তময়ী বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে জেনারেল মেডিসিনে এমডি করেন। এরপর ইনস্টিটিউট অফ নিউরো সায়েন্স কলকাতা থেকে নিউরোলজিতে ডিআরএনবি ডিগ্রি লাভ করেন।
সাফল্যের প্রভাব ও প্রেরণা
বর্তমানে কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ নিউরো সায়েন্সে অ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্ট হিসাবে কর্মরত অনুশ্রী আজ বহু পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীর কাছে এক জীবন্ত প্রেরণা। কঠোর পরিশ্রম, খালি পেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিউটি এবং বিনিদ্র রজনী পার করে তাঁর এই অর্জন প্রমাণ করে যে, দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকেই জয় করা সম্ভব। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের জন্য পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো এবং বলরামপুরের বিধায়ক জলধর মাহাতো তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। অনুশ্রীর এই গৌরবময় উত্থান জঙ্গলমহলের মতো প্রান্তিক এলাকার চিকিৎসা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং আগামী প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষায় ব্রতী হতে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করবে।