পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক কোনো অপরাধ নয়! ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

দিল্লি: সুপ্রিম কোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পেশ করেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, দুই অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্কের পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা মানেই ওই ব্যক্তির চরিত্র খারাপ—এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।
তেলেঙ্গানার এক পুলিশ কনস্টেবল পদের প্রার্থীর চাকরি বাতিলের মামলা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি পিটিশনের প্রেক্ষিতে আদালত এই রায় দিয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৪ সালে। তেলেঙ্গানার এক যুবক পুলিশ চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন এবং সাময়িকভাবে নির্বাচিতও হয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৪ সালেই তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়। অভিযোগ ছিল, এক মহিলার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের পর ওই যুবক তাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেছেন।
২০১৫ সালেই লোক আদালতের মাধ্যমে উভয়পক্ষের সমঝোতায় সেই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যায়। যুবকটি তার চাকরির আবেদনে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখও করেছিলেন। কিন্তু ‘নৈতিক স্খলন’ (Moral Turpitude)-এর কারণ দেখিয়ে তেলেঙ্গানা পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড তার নিয়োগ বাতিল করে দেয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ বিচারপতি মনমোহন এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ এই মামলার শুনানি করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। বিচারপতিরা বলেন:
“ভারতে এমন কোনো আইন নেই যা দুই অবিবাহিত ব্যক্তির পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ককে অপরাধ বলে গণ্য করে। তাই, এমন সম্পর্কে লিপ্ত থাকলেই কারোর চরিত্র খারাপ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। প্রতিটি প্রেমের সম্পর্ক বা শারীরিক মিলন বিয়েতেই শেষ হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কোনো সম্পর্ক বিয়েতে গড়ায়নি মানেই যে কেউ কাউকে প্রতারণা করেছে, তা ধরে নেওয়া ভুল। পরিবর্তিত সামাজিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”
মহিলার সাক্ষ্য ও আইনি ব্যাখ্যা আদালত আরও জানায়, লোক আদালতের মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তির অর্থ এই নয় যে ওই যুবক নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন। সমঝোতা যে জোরপূর্বক করা হয়েছিল, তার কোনো প্রমাণ না থাকলে নিয়োগকারী সংস্থা এটিকে কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে পারে না। এই মামলায় যে মহিলা অভিযোগ করেছিলেন, তিনি অভিযুক্তের প্রতিবেশী ছিলেন। মহিলাটি যদি সত্যিই প্রতারিত হতেন, তবে তাকে আদালতে এসে সাক্ষী দিতে হতো। কিন্তু তিনি নিজেই মামলা তুলে নিতে সম্মত হয়েছিলেন, তাই পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড নিজের সিদ্ধান্তে ওই মহিলাকে প্রতারিত বলে দাবি করতে পারে না।
একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না “কারোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলেও যদি তা মিটে গিয়ে থাকে, তবে সেই ভিত্তিতে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ওই ব্যক্তি সত্যিই অপরাধ করেছেন কি না বা তার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ আছে কি না—তা যাচাই না করে কেবল একটি অভিযোগের ভিত্তিতে কারো চরিত্র বিচার করা যায় না,” আধিকারিকদের উদ্দেশে মন্তব্য করে আদালত।
এই মামলায় ওই যুবকের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ না থাকায় এবং অভিযোগকারী নিজেই মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ায়, তার নিয়োগ বাতিল করার সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। হাইকোর্টের আগের রায় বাতিল করে বিচারপতিরা ওই যুবককে চাকরিতে নিয়োগের পথ প্রশস্ত করেছেন।