প্রতীক উর ইস্যুতে সেলিমের ‘সন্তান হারানোর’ যন্ত্রণা না কি অহংকার? আলিমুদ্দিনের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তুমুল অস্বস্তি

বিধানসভা নির্বাচনের মুখে বঙ্গ সিপিএমের অন্দরে বিদ্রোহের আগুন এখন দাবানল। তরুণ তুর্কি প্রতীক উর রহমানের দলত্যাগ এবং রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ভূমিকা নিয়ে যখন রাজনৈতিক মহলে তোলপাড়, ঠিক তখনই আলিমুদ্দিনের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কার্যত কোণঠাসা হতে হলো সেলিমকে। দলের অভ্যন্তরীণ চাপে মেজাজ হারালেও শেষ পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে ‘সন্তান হারানোর’ আবেগী তাস খেললেন তিনি। কিন্তু সেই আবেগের আড়ালে কি রয়ে গেল গভীর ঔদ্ধত্য? প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে।
মুজফফর আহমেদ ভবনের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে চরম অস্বস্তিতে সেলিম
প্রতীক উর রহমানের বিদ্রোহের পর থেকেই দলের অন্দরে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন মহম্মদ সেলিম। বৃদ্ধ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু আসরে নামলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি। দুই দিনের রাজ্য কমিটির বৈঠকে যখন প্রতীক ইস্যু নিয়ে ঝড় ওঠে, তখন সহকর্মীদের তোপের মুখে কার্যত ঢোঁক গিলতে হয় সেলিমকে। এর আগে প্রতীক উরকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেও, দলের অন্দরে সমালোচনার মুখে পড়ে সাংবাদিক সম্মেলনে সুর বদলাতে বাধ্য হন তিনি।
‘সন্তান হারানোর সমান যন্ত্রণা’ বনাম ‘মৃতদেহ আগলে রাখা সায়েন্টিফিক নয়’
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সেলিম একদিকে যেমন আবেগঘন হয়ে বলেন, “প্রতীক উরকে হারানো আমার কাছে সন্তান হারানোর সমান,” ঠিক তার পরেই তাঁর মন্তব্যে ফুটে ওঠে কঠোর মনোভাব। প্রতীকের ব্র্যান্ড ভ্যালু যে সিপিএম-এর অবদান, তা মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি তিনি। তবে সবচেয়ে বিতর্কিত বয়ানটি আসে এর ঠিক পরেই। সেলিম বলেন, “মা সন্তানের মৃতদেহ আগলে রাখে! এটা সায়েন্টিফিক নয়।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি কি পরোক্ষভাবে প্রতীক উরকে রাজনৈতিকভাবে ‘মৃত’ বলে দেগে দিলেন? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বাম কর্মীদের মনে।
তৃণমূলের প্রশংসায় প্রতীক উর আর সেলিমের দায় ঝেড়ে ফেলা
দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তেই প্রতীক উর রহমান প্রকাশ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করেছেন। এতে তাঁর ঘাসফুল শিবিরে যোগ দেওয়ার জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সেলিম সরাসরি জানিয়ে দেন যে তিনি কোনো ‘শুনানি’ বা ‘রায়’ দিতে বসেননি। নিজের ব্যক্তিগত দায় এড়িয়ে পুরো বিষয়টি এখন দলের অভ্যন্তরীণ কমিটির ওপর ঠেলে দিয়েছেন তিনি।
এবার তবে কোন পথে প্রতীক উর
সেলিমের কথাতেই স্পষ্ট যে, প্রতীক উরকে ফেরানোর কোনো সদিচ্ছা আপাতত আলিমুদ্দিনের নেই। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সংবাদমাধ্যম থেকেই তিনি প্রতীকের অন্য দলের সাথে যোগাযোগের খবর পাচ্ছেন। এখন দেখার, প্রতীক উর শেষ পর্যন্ত কোন পতাকা হাতে তুলে নেন এবং সেলিমের এই ‘অহংকারী বনাম আবেগপ্রবণ’ অবস্থান সিপিএমের ভোটব্যাঙ্কে কী প্রভাব ফেলে।
প্রতীক উর রহমানকে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার এখন দলের হাতে ছেড়ে দিয়ে আপাতত দায়মুক্ত হতে চাইছেন মহম্মদ সেলিম। তবে বঙ্গ রাজনীতির কারবারিদের মতে, এক উজ্জ্বল তরুণ মুখকে হারানোর ক্ষত সিপিএম-এর জন্য দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।