‘কোন অংশ অবৈধ, তারপর উত্তর দেব!’ পুরসভার নোটিস নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে চরম মেজাজ হারালেন অভিষেক

কলকাতা পুরসভার বারান্দায় ‘ক্লাব রুম’ অধিবেশন এবং সজল ঘোষের পুরবোর্ড ভেঙে দেওয়ার দাবির মাঝেই, নিজের শান্তিনিকেতনের বাসভবনে পাঠানো পুরসভার জোড়া নোটিস নিয়ে এবার নজিরবিহীনভাবে মেজাজ হারালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার কালীঘাটে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে পুরপ্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত হাই-প্রোফাইল বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতেই এই ঘটনা ঘটে। বাড়ির অবৈধ অংশ ভাঙার নির্দেশ সংক্রান্ত প্রশ্ন শুনেই রীতিমতো ‘তেলেবেগুনে’ জ্বলে ওঠেন তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড।
একদিকে যখন ডেবরা, কালনা ও ডানকুনির মতো এলাকায় একের পর এক তৃণমূল নেতা পুলিশের জালে ধরা পড়ছেন, ঠিক অন্যদিকে খোদ কলকাতার বুকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বাড়ির নোটিস বিতর্ক এবং অভিষেকের এই ক্ষোভ প্রকাশ ছাব্বিশের রাজনৈতিক আবহে নতুন মাত্রা যোগ করল।
গাড়ির কাচ নামিয়ে ক্ষোভ, পুরসভাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ
শুক্রবার বিকেলে কালীঘাটের মেগা বৈঠক শেষে যখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের গাড়িতে উঠছিলেন, তখনই সাংবাদিকরা তাঁকে পুরসভার নোটিস ও অবৈধ অংশ ভাঙার নির্দেশিকা নিয়ে প্রশ্ন করেন। প্রশ্ন শুনে প্রথমে এড়িয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে কাচ তুলে দিলেও, সাংবাদিকদের ক্রমাগত প্রশ্নের মুখে শেষমেশ গাড়ির কাচ নামাতে বাধ্য হন তিনি।
তীব্র উষ্মা প্রকাশ করে গলার স্বর চড়িয়ে অভিষেক সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন:
“যাঁরা এসব প্রশ্ন করছেন, তাঁরা আগে কলকাতা পুরনিগমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করুন যে অবৈধ অংশটা কোথায়! আগে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে আসুন, কোন অবৈধ অংশ? পুরসভা আগে সেই অবৈধ অংশটা সুনির্দিষ্টভাবে ‘মার্ক’ (চিহ্নিত) করে দিক, তারপর আমার থেকে উত্তর নিয়ে যাবেন। যান!”
এই কথা বলেই তিনি দ্রুত গাড়ির কাচ তুলে দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এর আগে এই বিষয়ে সাধারণ বিবৃতি দিলেও, সরাসরি ক্যামেরার সামনে অভিষেকের এই রণংদেহী মেজাজ ও ক্ষোভ প্রকাশ অভূতপূর্ব।
‘এরকম নোটিস দিয়ে বাড়ি ভাঙা যায় না’, কালীঘাটের বৈঠকে সরব মমতা-অভিষেক
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এদিন কালীঘাটের অভ্যন্তরে কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরদের নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে যে জরুরি বৈঠক হয়, সেখানেও অভিষেকের বাড়িতে পাঠানো পুরসভার এই নোটিস প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। বৈঠকে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যৌথভাবে পুর-প্রশাসনের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন।
বৈঠকের অন্দরের খবর অনুযায়ী, শীর্ষ নেতৃত্ব কাউন্সিলরদের সামনে স্পষ্ট জানান:
“আইন ও নিয়ম মেনে কোনো শুনানি বা ‘হিয়ারিং’ (Hearing) না ডেকে এভাবে হুট করে নোটিস দিয়ে কোনো বাড়ি বা নির্মাণ ভাঙা যায় না। পুরসভা যেভাবে এই বিষয়টি পরিচালনা করেছে, তা সম্পূর্ণ আইন-বহির্ভূত।” একই সাথে পুরপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, “কাউন্সিলররা ভয় না পেয়ে রাস্তায় থাকুন, মানুষকে পরিষেবা দিন। কাজে বাধা দিলে প্রয়োজনে ধর্নায় বসুন, লড়াইয়ে থাকুন।”
‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে!’ তীব্র কটাক্ষ বিজেপির
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মেজাজ হারানোকে হাতিয়ার করে আসরে নামতে দেরি করেনি গেরুয়া শিবির। বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার এই ঘটনাকে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “রাজ্যজুড়ে এত চুরি-জোচ্চুরির বন্যার পর, যিনি একসময় দলের একাংশের কাছে হিরো ছিলেন, তাঁর সেই তথাকথিত হিরোগিরি এখন পুরোপুরি চুপসে গিয়েছে। এই কঠিন সময়ে কেউ যদি তাঁকে পুরসভার নোটিস নিয়ে প্রশ্ন করে, তবে তো সেটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়ার মতোই লাগবে!” তিনি আরও যোগ করেন, স্বজনপোষণ এবং প্রশাসনের জোরে টিকে থাকা কোনো ব্যক্তির থেকে রাজনৈতিক সৌজন্য আশা করা বৃথা।
একদিকে নবান্নের খরচ কমাতে বিকাশ ভবনে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নজিরবিহীন নির্দেশিকা, অন্যদিকে মেটিয়াবুরুজের কাউন্সিলরের মাধ্যমে রাস্তায় নমাজ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তৃণমূলের আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি— এই সবকিছুর মাঝে খোদ কালীঘাটের বৈঠক থেকে পুর-আমলাদের পদক্ষেপকে ‘আইন-বহির্ভূত’ আখ্যা দেওয়া এবং অভিষেকের এই ক্ষোভ, আগামী দিনে কলকাতা পুরসভার অন্দরে এক বড়সড় প্রশাসনিক ও আইনি সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।