সুজিত-ঘনিষ্ঠ আরও এক হেভিওয়েট গ্রেফতার! এবার পুলিশের জালে দক্ষিণ দমদমের দাপুটে কাউন্সিলর টিংকু

কলকাতায় জোড়া নোটিসের জবাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা চ্যালেঞ্জ, মেটিয়াবুরুজের কাউন্সিলরের রাস্তায় নমাজ বিতর্কে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি এবং মেখলিগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফ-বিজিবি-র চরম উত্তেজনার মাঝেই, কলকাতা সংলগ্ন এলাকা থেকে আরও এক হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির খবর সামনে এল। রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকেই পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি যেভাবে ‘দাবাং মুডে’ অ্যাকশন শুরু করেছে, তার জেরে এবার টান পড়ল বিধাননগরের প্রভাবশালী মহলে। প্রাক্তন দমকল মন্ত্রী সুজিত বসুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তথা ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত দাপুটে তৃণমূল নেতা পার্থ ভার্মা ওরফে টিংকু-কে গ্রেফতার করল লেকটাউন থানার পুলিশ। ধৃত টিংকু বর্তমানে দক্ষিণ দমদম পৌরসভার ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারম্যান-ইন-কাউন্সিল (MMIC) পদের দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর এই আকস্মিক গ্রেফতারির ঘটনায় উত্তর ২৪ পরগনার রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে।
ভোট-পরবর্তী হিংসা ও দোকান দখল করে পার্টি অফিস বানানোর অভিযোগ
লেকটাউন থানা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধৃত কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী হিংসার ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ।
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে:
- জোরপূর্বক জমি ও দোকান দখল: পার্থ ভার্মা ওরফে টিংকু-র বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২১ সালের ভোটের পর দক্ষিণদাড়ি এলাকায় এক সাধারণ ব্যবসায়ীর দোকান ঘর জোর করে সশরীরে দখল করে নেন তিনি এবং সেখানে বেআইনিভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস তৈরি করা হয়।
- বিরোধী কর্মীদের ওপর হামলা: ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই সময় ওই এলাকায় একাধিক বিরোধী দলের কর্মী ও সমর্থকদের ওপর চড়াও হওয়া, তাঁদের বাড়িঘর ভাঙচুর এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্থা করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতে লেকটাউন থানার পুলিশ গোপনে তদন্ত চালাচ্ছিল। অবশেষে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ হাতে আসতেই শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে পাকড়াও করা হয়।
বিধাননগর থেকে দমদম— শ্রীঘরে সুজিত বসুর ‘সিন্ডিকেট বাহিনী’?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা ও পুর-স্তরের জনপ্রতিনিধিদের গ্রেফতারির তালিকায় এই নতুন সংযোজন ঘাসফুল শিবিরের অস্বস্তি ও রক্তচাপ এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দিল। পার্থ ভার্মা হলেন সুজিত বসুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি, ফলে তাঁর গ্রেফতারি সরাসরি লেকটাউন, শ্রীভূমি ও দমদম বেল্টে প্রাক্তন মন্ত্রীর রাজনৈতিক দুর্গে মস্ত বড় ধাক্কা।
এর আগে বিধাননগর পৌর নিগমের একাধিক ওয়ার্ডের হেভিওয়েট কাউন্সিলরদেরও পুলিশ বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় লক-আপে পুরেছে:
- সমরেশ চক্রবর্তী: বিধাননগর পৌর নিগমের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, যিনি ইতিমধ্যেই পুলিশের জালে।
- সুশোভন মণ্ডল: ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রভাবশালী কাউন্সিলর, ধৃত।
- রঞ্জন পোদ্দার: ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, যিনিও একাধিক অভিযোগে বর্তমানে শ্রীঘরে।
একদিকে যখন দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘সুশাসন’ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়ার মেগা বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক অন্যদিকে দক্ষিণ দমদমের এই মেগা গ্রেফতারি প্রমাণ করছে যে নতুন সরকারের জমানায় পুরোনো সিন্ডিকেট, ভোট-পরবর্তী হিংসার হোতা এবং বেআইনি দখলদারদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে এগোচ্ছে পুলিশ। হুগলির পাণ্ডুয়ায় কন্যাসন্তান খুনে মা-বাবার যাবজ্জীবনের কড়া রায়ের দিনই কলকাতার দোরগোড়ায় এই হেভিওয়েট গ্রেফতারি আগামী দিনে সুজিত বসুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং উত্তর ২৪ পরগনার ঘাসফুল শিবিরের রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল।