শেষরক্ষা হলো না! সুড়ঙ্গ-যুক্ত রাজপ্রাসাদের মালিক পলাতক তৃণমূল নেতা শামিম গ্রেফতার

দক্ষিণ দমদমে প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু-ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর টিংকুর গ্রেফতারি এবং চাণক্যের সাফল্যের গোপন মন্ত্রের চর্চার মাঝেই, রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ও চাঞ্চল্যকর খবরটি এল হাওড়া জেলা থেকে। গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় যার রাজপ্রাসাদোপম বাড়ি এবং তার ভেতরের ‘গুপ্ত সুড়ঙ্গ’ নিয়ে তোলপাড় চলছিল, সেই পলাতক তৃণমূল নেতা শামিম আহমেদ ওরফে বড়ে-কে অবশেষে গ্রেফতার করল পুলিশ। গত দুই সপ্তাহ ধরে গা ঢাকা দিয়ে থাকা এই দাপুটে নেতাকে সুদূর মায়ানগরী মুম্বই থেকে যৌথ অভিযান চালিয়ে পাকড়াও করেছে হাওড়া সিটি পুলিশ ও মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চ।
বিজেপি কর্মীদের ওপর নৃশংস হামলা, ভোট-পরবর্তী হিংসা এবং রামনবমীর মিছিলে বোমাবাজির মতো একাধিক গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত এই তৃণমূল নেতার গ্রেফতারি হাওড়ার রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে।
টানা দুই সপ্তাহের লুকোচুরি, মুম্বইয়ে যৌথ হানা পুলিশের
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকেই পুলিশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় নাম ছিল শামিমের। গত দুই সপ্তাহ ধরে তাঁর সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছিল পুলিশ। অবশেষে গোপন সূত্রে খবর মেলে যে, গ্রেফতারি এড়াতে মুম্বইয়ের এক অজ্ঞাত আস্তানায় আশ্রয় নিয়েছেন এই হেভিওয়েট নেতা। বৃহস্পতিবার রাতে মুম্বই অপরাধদমন শাখা (Crime Branch) এবং হাওড়া সিটি পুলিশের একটি বিশেষ দল যৌথভাবে সেখানে হানা দেয়। ঘটনাস্থল থেকে মূল অভিযুক্ত শামিম আহমেদ ওরফে বড়েসহ তাঁর দুই প্রধান সহযোগী জাভেদ আখতার এবং ক্রান্তিকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়।
ভাইরাল সেই রাজপ্রাসাদ এবং ‘গুপ্ত সুড়ঙ্গের’ রহস্য
কিছুদিন আগেই হাওড়ায় শামিমের এই তিনতলা বিলাসবহুল বাড়ির একটি খানা-তল্লাশির ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় মারাত্মক ভাইরাল হয়েছিল। ভোট-পরবর্তী হিংসার তদন্তে বড়ের বাড়িতে পুলিশ ঢুকতেই চোখ চড়কগাছ হয়ে যায় তদন্তকারীদের। সাধারণ একটি বাড়ির আড়ালে ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক আধুনিক রাজপ্রাসাদ।
তদন্তে উঠে আসা বাড়ির কিছু রোমাঞ্চকর দিক:
- লুকোনো সুড়ঙ্গ ও গুপ্ত পথ: তিনতলা থেকে আচমকা দোতলায় নামার জন্য একটি অত্যন্ত সুকৌশলে তৈরি গোপন পথ বা সুড়ঙ্গের হদিশ পায় পুলিশ। আপদকালীন পরিস্থিতিতে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতেই এই গোপন পথ তৈরি করা হয়েছিল বলে অনুমান।
- বিলাসবহুল অন্দরমহল: তিনতলার ঘরগুলি সাধারণ দেখতে হলেও, দোতলার ঘরগুলিতে পা রাখতেই দেখা যায় একের পর এক চোখধাঁধানো বিলাসবহুল আসবাবপত্র ও গ্যাজেট। সাধারণ এক নেতার বাড়িতে এত কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ও আসবাব কোথা থেকে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পুলিশ।
বোমাবাজি থেকে রামনবমীতে হামলা— দীর্ঘ অপরাধের খতিয়ান
পদ্ম শিবিরের অভিযোগ, রাজ্যের হেভিওয়েট তৃণমূল নেতা তথা বিদায়ী মন্ত্রী অরূপ রায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ডানহাত হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন এই বড়ো। তাঁর বিরুদ্ধে শিবপুর থানা এলাকায় বিরোধী বিজেপি কর্মীদের ওপর ধারাবাহিক অত্যাচার এবং ২০২১ ও ছাব্বিশের ভোট-পরবর্তী হিংসা ছড়ানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, এর আগেও হাওড়ায় রামনবমীর শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রায় পরিকল্পিতভাবে হামলা ও বোমাবাজি চালানোর অভিযোগে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছিল। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় নিজের এলাকা জুড়ে ‘সিন্ডিকেট ও ডন’ রাজ চালাচ্ছিলেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যখন দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘সুশাসন ও জিরো ক্রাইম’ নীতি নিয়ে মেগা বৈঠক শেষ হয়েছে, ঠিক অন্যদিকে ডেবরা, বিধাননগর, দক্ষিণ দমদমের পর হাওড়ার এই কুখ্যাত ‘সুড়ঙ্গ ডন’-এর পতন প্রমাণ করছে যে নতুন সরকারের জমানায় অপরাধীদের ডানা ছাঁটতে পুলিশকে সম্পূর্ণ ফ্রি-হ্যান্ড দেওয়া হয়েছে। এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির পর হাওড়া জেলায় তৃণমূলের অন্দরের আর্থিক লেনদেন এবং মন্ত্রীদের সঙ্গে শামিমের ঠিক কী ধরণের আর্থিক যোগসূত্র ছিল, তা খতিয়ে দেখতে এবার বড়েকে রিমান্ডে নিয়ে জেরা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে হাওড়া সিটি পুলিশ।