‘পকসো মামলা তোলো, না হলে খুন!’ নির্যাতিতার পরিবারকে বিজেপি নেতার হুমকির অভিযোগে তীব্র উত্তেজনা

হাওড়ায় ‘গুপ্ত সুড়ঙ্গ’ প্রাসাদের মালিক শামিম আহমেদ ওরফে বড়োকে মুম্বই থেকে গ্রেফতার এবং দক্ষিণ দমদমে সুজিত বসু-ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর টিংকুর শ্রীঘরে যাওয়ার খবরের মাঝেই, এবার নদিয়া জেলার শান্তিপুরে এক নাবালিকার পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম রাজনৈতিক শোরগোল শুরু হলো। দেড় বছর পুরোনো একটি পকসো (POCSO) মামলা তুলে নেওয়ার জন্য এলাকার এক দাপুটে বিজেপি নেতার নেতৃত্বে নির্যাতিতার পরিবারের ওপর লাগাতার চাপ সৃষ্টি এবং খুনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে আসরে নেমেছে প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের নতুন সরকারের জমানায় এই ঘটনা শান্তিপুর থানা এলাকায় তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছে।
দেড় বছর আগের অপরাধ, অভিযুক্ত এখনও শ্রীঘরে
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। শান্তিপুর থানা এলাকায় এক নাবালিকাকে শ্লীলতাহানি করার অভিযোগ ওঠে তাঁরই এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। ঘটনার পর নির্যাতিতার পরিবার শান্তিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ পকসো আইনে মামলা রুজু করে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। সেই থেকে বিগত প্রায় দেড় বছর ধরে অভিযুক্ত ব্যক্তি জেল হেফাজতেই রয়েছেন এবং মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
মামলা তুলতে বাড়িতে চড়াও বিজেপি বুথ সভাপতি!
নির্যাতিতার পরিবারের বিস্ফোরক অভিযোগ, রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকেই সমীকরণ বদলে গেছে। অভিযোগ, ধৃতের পরিবারের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় বিজেপি বুথ সভাপতি নির্যাতিতার বাড়িতে চড়াও হচ্ছেন। পকসো মামলাটি আদালত থেকে তুলে না নিলে সপরিবারে প্রাণে মেরে ফেলা হবে বলে স্পষ্ট হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আইনি লড়াই লড়তে গিয়ে এখন কার্যত প্রাণভয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে পীড়িত পরিবারটিকে।
এই ঘটনা নিয়ে শান্তিপুরের রাজনৈতিক পারদ চড়তেই কড়া ভাষায় বিজেপিকে আক্রমণ করেছেন স্থানীয় তৃণমূলের গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান বীরেন মাহাতো। তিনি বলেন:
“পকসো মামলাটি আদালতে চলছে। রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই তাদের বুথ সভাপতি এবং দলের কর্মীরা ওই পীড়িত পরিবারটির ওপর জোর-জুলুম শুরু করেছে। ক্ষমতার অহংকারে নাবালিকার পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছি এবং আশা করি অপরাধীদের কঠোর শাস্তি হবে।”
পাল্টা সাফাই গেরুয়া শিবিরের
তৃণমূলের এই আক্রমণের মুখে পড়ে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছে বিজেপি নেতৃত্ব। শান্তিপুরের স্থানীয় বিজেপি নেতা সদানন্দ হালদার এই প্রসঙ্গে বলেন, “যে ব্যক্তি শ্লীলতাহানির অভিযোগে জেলে আছেন, তিনি আগে আমাদের দলের কর্মী ছিলেন ঠিকই। তবে বর্তমান বুথ সভাপতি এই হুমকির ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, তা আমার জানা নেই। যদি সত্যিই এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তবে আমাদের দল কখনো একে রেয়াত করবে না এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
থানায় নতুন এফআইআর, নিরাপত্তা বাড়াল পুলিশ
বিজেপি নেতার হুমকির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই শান্তিপুর থানায় নতুন করে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে নির্যাতিতার পরিবার। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই শান্তিপুর থানার পুলিশ ঘটনার তদন্তে নেমেছে। একই সাথে, নতুন সরকারের সুশাসন ও আইনের শাসন বজায় রাখার নীতি মেনে ওই নাবালিকা এবং তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি ও টহলদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
একদিকে যখন কোচবিহারে ভোটের আগের দিন বর্তমান স্পিকারকে অপমানের অভিযোগে আরও এক তৃণমূল কাউন্সিলরকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, ঠিক অন্যদিকে শান্তিপুরের এই ‘পকসো মামলা’ ঘিরে বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ছাব্বিশের রাজনৈতিক আবহে নদিয়া জেলায় তীব্র চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।