ভাটপাড়া-হালিশহরে ধস! কলকাতা পুরসভা আঁকড়ে লড়াইয়ের বার্তা! কালীঘাটের বৈঠকে কাউন্সিলরদের একগুচ্ছ টোটকা মমতার

শান্তিপুরের পকসো মামলা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং দক্ষিণ দমদমে দাপুটে কাউন্সিলর টিংকুর গ্রেফতারির মাঝেই, শুক্রবার বিকেলে কালীঘাটে বসেছিল এক হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক শক্তির মহড়া। রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর উত্তর ২৪ পরগনা ও ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে যখন একের পর এক পুরসভায় তৃণমূলের পতন ঘটছে, ঠিক তখনই নিজের কলকাতার ‘দুর্গ’ বাঁচাতে দলীয় কাউন্সিলরদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা পুরসভার ১৩৭ জন কাউন্সিলরের মধ্যে এদিন হাজির ছিলেন প্রায় ১০০ জন। ভাটপাড়া, হালিশহর ও গারুলিয়া পুরসভার ভঙ্গুর পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই কলকাতা পুরসভার জনপ্রতিনিধিদের পিছু না হটার এবং মাটি কামড়ে লড়াই করার একাধিক পরামর্শ দেন নেত্রী।
শুক্রবার বিকেলের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরদের ঠিক কী কী পরামর্শ ও নির্দেশ দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, আসুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
১. ‘কেউ পদত্যাগ করবেন না’, ডিসেম্বর পর্যন্ত মাটি কামড়ে থাকার নির্দেশ
ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে ঘাসফুল শিবির প্রায় ধুয়েমুছে সাফ হওয়ার পর কাউন্সিলরদের মধ্যে যে দলবদল ও পদত্যাগের হিড়িক উঠেছে, তা রুখতে কড়া বার্তা দিয়েছেন মমতা। তিনি স্পষ্ট জানান, “কেউ ভুল করেও পদ ছাড়বেন না। এখনও আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পুরসভার আইনি মেয়াদ রয়েছে। ততদিন পর্যন্ত নিজেদের ওয়ার্ডে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকুন এবং সাধারণ মানুষকে পরিষেবা দিন। আপনারা ভয় পেয়ে পদ ছাড়লেই ওরা (বিজেপি) সেই শূন্যস্থানে ঝাঁপিয়ে পড়বে।”
২. ক্লাব রুমে অধিবেশনের বদলা শনিবারে, ফিরহাদকে মেগা দায়িত্ব
শুক্রবার কলকাতা পুরসভার মূল অধিবেশন কক্ষ বন্ধ থাকায় তৃণমূল কাউন্সিলররা যেভাবে ‘ক্লাব রুমে’ সমান্তরাল অধিবেশন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাকে বিজেপির ‘গা-জোয়ারি’ বলে আখ্যা দেন নেত্রী। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বসে না থেকে শনিবারই কলকাতা জুড়ে পুর-প্রতিনিধিদের পথে নেমে তীব্র প্রতিবাদে শামিল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এই গোটা আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি এবং প্রতিবাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে।
৩. দেবলীনার জায়গায় নতুন মুখ, সন্দীপরঞ্জনকে নির্দেশ
ভবানীপুরের অন্তর্গত ৯ নম্বর বরোর চেয়ারপার্সন দেবলীনা বিশ্বাসের আকস্মিক পদত্যাগের পর সেই শূন্যস্থান পূরণেও দ্রুত পদক্ষেপ নেন মমতা। ওই বরোর দায়িত্ব যাতে হাতছাড়া না হয়, তার জন্য অবিলম্বে নতুন কাউকে সেখানে মনোনীত করার জন্য বর্ষীয়ান কাউন্সিলর সন্দীপরঞ্জন বক্সিকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন দলনেত্রী।
৪. ‘বুলডোজার দিয়ে যখন-তখন বাড়ি ভাঙা যায় না’, নোটিস বিতর্কে সরব নেতৃত্ব
কালীঘাটের এই বৈঠকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শান্তিনিকেতনের বাড়িতে কলকাতা পুরসভার পাঠানো জোড়া নোটিস ও অবৈধ অংশ ভাঙার নির্দেশিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। মমতা ও অভিষেক যৌথভাবে কাউন্সিলরদের সামনে জানান, এভাবে স্রেফ একটা নোটিস পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কারও বাড়ি বা নির্মাণ ভেঙে দেওয়া যায় না। পুরসভার নিজস্ব আইনি পদ্ধতি ও শুনানি (Hearing)-র নিয়ম আছে। বিজেপি স্রেফ ক্ষমতার অপব্যবহার করে গায়ের জোরে এসব করছে।
৫. ‘ভয় পাবেন না, রাস্তায় থাকুন’
বৈঠকে দেবাশিস কুমার, তারক সিং, জুঁই বিশ্বাস বা বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্তের মতো হেভিওয়েটরা অনুপস্থিত থাকলেও, উপস্থিত ১০০ জন কাউন্সিলরকে এককাট্টা হয়ে থাকার কড়া দাওয়াই দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর শেষ বার্তা ছিল একটাই, “ভয় পেয়ে কেউ দমে যাবেন না। বুক চিতিয়ে রাস্তায় থাকুন, মানুষের কাজ করুন এবং কাজে বাধা দিলে প্রয়োজনে ধরণায় বসুন। লড়াইয়ের ময়দান ছাড়া যাবে না।”
একদিকে যখন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুশাসন নিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক বৈঠক সারছেন, ঠিক অন্যদিকে কালীঘাটের এই জরুরি বৈঠক প্রমাণ করছে যে, মেয়াদের আগে কলকাতা পুরসভার রাশ যাতে কোনোভাবেই গেরুয়া শিবিরের হাতে চলে না যায়, তার জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করতে পুর-প্রতিনিধিদের এক সুতোয় বাঁধতে চাইছেন মমতা-অভিষেক জুটি।