তোলা না দিলে দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি! গ্রেফতার কলকাতা পুরসভার দাপুটে কাউন্সিলর সুদীপ পোল্লে

বরাহনগরে তৃণমূল নেতা শঙ্কর রাউত এবং গারুলিয়া পুরসভার ১১ জন কাউন্সিলরের গণ-ইস্তফার মেগা ধাক্কার রেশ কাটতে না কাটতেই, কলকাতার বুকে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ডামাডোল তৈরি হলো। এবার খোদ কলকাতা পুরসভার (KMC) হেভিওয়েট তথা দাপুটে তৃণমূল কাউন্সিলর সুদীপ পোল্লেকে তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করল পুলিশ। শনিবার রাতে বেহালা এলাকা থেকে কলকাতা পুরসভার ১২৩ নম্বর ওয়ার্ডের এই কাউন্সিলর তথা ১৬ নম্বর বরোর চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করে ঠাকুরপুকুর থানার পুলিশ।

প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং সুশাসনের জমানায় এই প্রথম কলকাতা পুরসভার দায়িত্বরত কোনও তৃণমূল কাউন্সিলর সরাসরি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেন। বিশেষ করে, গত শুক্রবার কলকাতা পুরসভার ঐতিহ্যবাহী অধিবেশন কক্ষে তালা ঝোলানোর জেরে ‘হাউসের বাইরে হাউস’ বসানোর মেগা বিক্ষোভে যিনি প্রথম সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এই হেভিওয়েট নেতার গ্রেফতারি ঘাসফুল শিবিরের জন্য এক চরম বিড়ম্বনা তৈরি করল।

৫ লক্ষ টাকা তোলা দাবি, না দিলে দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার মেগা হুমকি

ঠাকুরপুকুর থানা ও লালবাজার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকালে বেহালার শীলপাড়া এলাকার এক নামী ব্যবসায়ী সুদীপ পোল্লের বিরুদ্ধে থানায় একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

ব্যবসায়ীর দায়ের করা অভিযোগে যা জানা গেছে:

  • ৫ লক্ষ টাকার তোলাবাজি: সুদীপ পোল্লে এবং তাঁর অনুগামীরা দীর্ঘদিন ধরেই ওই ব্যবসায়ীকে ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছিলেন। সম্প্রতি তাঁর কাছ থেকে নগদ ৫ লক্ষ টাকা তোলা বা কাটমানি চাওয়া হয়।
  • দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি: ব্যবসায়ী ওই বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে অস্বীকার করায়, তাঁর ওপর চড়াও হওয়া হয় এবং টাকা না দিলে তাঁর দোকান জেসিবি বা বুলডোজার দিয়ে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলে তৃণমূল কাউন্সিলর খোদ হুমকি দেন।

লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর ঠাকুরপুকুর থানার পুলিশ তদন্তে নামে এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলতেই শনিবার রাতে বেহালা থেকে সুদীপকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃত কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (BNS)-র একাধিক কড়া ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং আজ রবিবারই তাঁকে আদালতে পেশ করা হবে।

শোভন-ফিরহাদ ঘনিষ্ঠ সুদীপের পতন, পুরসভায় তালা বিতর্কের পর চরম অস্বস্তি

রাজনৈতিক অলিন্দ সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সাল থেকে বেহালার ১২৩ নম্বর ওয়ার্ডের নাগাড়ে কাউন্সিলর সুদীপ পোল্লে। একসময় বেহালার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা সুদীপ পরবর্তীতে কলকাতার বিদায়ী মেয়র ফিরহাদ হাকিমেরও আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। যদিও ২০২৪ সালে বেহালার একটি বেআইনি নির্মাণজনিত ঘটনায় ফিরহাদ হাকিম প্রকাশ্যে সুদীপকে কড়া বকাঝকা করেছিলেন। এর আগে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলাতেও তাঁর বাড়িতে সিবিআই (CBI) তল্লাশি চালিয়েছিল।

এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, সুদীপের দাপট ও সিন্ডিকেট রাজের কারণে বেহালার শখের বাজার ও শীলপাড়া চত্বরের ব্যবসায়ীরা তটস্থ থাকতেন। এমনকি বিজেপির অভিযোগ, অতীতে সখের বাজারে গেরুয়া শিবিরের নির্বাচনী মঞ্চে ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনাতেও এই সুদীপের সরাসরি মদত ছিল।

একদিকে যখন আজ রবিবার বিকেলে নন্দীগ্রামের মাটিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মহাসংবর্ধনাসভাকে কেন্দ্র করে পূর্ব মেদিনীপুরে সাজ সাজ রব এবং অন্যদিকে কুণাল ঘোষের ‘কচ্ছপ পোস্ট’ ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদী কবিতা ‘দখল’ নিয়ে রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে— সেই অলআউট রাজনৈতিক যুদ্ধের সমান্তরালে খোদ কলকাতার বুকে দাপুটে কাউন্সিলর সুদীপ পোল্লের এই গ্রেফতারি প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, দুর্নীতি ও তোলাবাজি দমনে নব্য প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতেই এগোচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *