রাজনৈতিক রং ছাপিয়ে বারবার মক্কেলের পাশে পেশাদার আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য

প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অদিতি মুন্সি ও তাঁর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তীর মামলায় বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের সওয়াল করা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। দলের অন্দরে একাংশের সমালোচনা সত্ত্বেও নিজের পেশাদার অবস্থানে অনড় এই প্রবীণ আইনজীবী। রাজনৈতিক মতাদর্শকে দূরে সরিয়ে আইনি লড়াইয়ে মক্কেলের অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়ার এই ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিক হাই-প্রোফাইল বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের হয়ে আদালত কক্ষে লড়াই করেছেন তিনি।
পেশাদারিত্ব বনাম রাজনীতি এবং বিকাশের যুক্তি
আইনজীবী হিসেবে যে কোনো মামলা গ্রহণ করার অধিকারকে বরাবরই ঊর্ধ্বে রেখেছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, পেশাদার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক রং দেখে তিনি মক্কেল নির্বাচন করেন না। দলের একাংশের আপত্তির জবাবে তিনি জানিয়েছেন, বামপন্থী কর্মীদের ওপর আক্রমণ বা খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষে তিনি দাঁড়ালে আপত্তি তোলা যুক্তিযুক্ত হতো। এমনকি আইনি প্রয়োজনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কাছে এলে, তিনি তাঁর হয়েও আদালতে সওয়াল করতে প্রস্তুত।
অতীতের হাই-প্রোফাইল মামলা ও আইনি লড়াই
অদিতি মুন্সি বা দেবরাজ চক্রবর্তীর আগে তৃণমূল ও বিজেপি শিবিরের একাধিক প্রথম সারির নেতার আইনি ঢাল হয়ে উঠেছেন এই বামপন্থী আইনজীবী।
২০১৯ সালে তৎকালীন বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের বিরুদ্ধে বড়বাজার থানার দায়ের করা একটি অর্থ উদ্ধার সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। সেই পরোয়ানা খারিজের আবেদনে মুকুল রায়ের পক্ষে কলকাতা হাইকোর্টে সওয়াল করেন বিকাশবাবু, যার জেরে আদালত পরোয়ানাটি খারিজ করে দেয়।
একই বছরে বিধাননগর পৌরনিগমের তৎকালীন মেয়র তথা তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলে, সেই প্রস্তাবের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন সব্যসাচী। সেই মামলাতেও তাঁর পক্ষে সওয়াল করেছিলেন বিকাশ ভট্টাচার্য। এছাড়া, তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর অর্জুন সিংয়ের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা দায়ের হলে, আইনি সুরক্ষার খোঁজে হাইকোর্টে বিকাশরঞ্জনের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তিনিও।
কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
আইনজীবী সমাজের মতে, এই ধরনের ঘটনা পেশাগত দায়বদ্ধতার একটি বড় দৃষ্টান্ত। একজন চিকিৎসকের মতো একজন আইনজীবীর কাছেও মক্কেলের রাজনৈতিক পরিচয় গৌণ হওয়া উচিত—বিকাশরঞ্জনের এই অবস্থান সেই নীতিকেই পুনর্ব্যক্ত করে। তবে রাজনৈতিক দিক থেকে এটি মিশ্র প্রভাব ফেলছে। দলীয় কর্মীদের একটি বড় অংশ যেখানে মাঠপর্যায়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালাচ্ছেন, সেখানে শীর্ষ নেতার এমন পেশাদার পদক্ষেপ দলের নিচুতলায় সাময়িক বিভ্রান্তি বা ক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, এটি বিচারব্যবস্থা ও আইনি পেশার নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে জনসাধারণের কাছে আরও সুদৃঢ় করছে।