শৃঙ্খল ভাঙার গানে আজও কাঁপে শোষকের গদি, নজরুল জন্মতিথি কি তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত প্রতিবাদ?

শৃঙ্খল ভাঙার গানে আজও কাঁপে শোষকের গদি, নজরুল জন্মতিথি কি তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত প্রতিবাদ?

আজ বাংলা সাহিত্যে ‘ধূমকেতু’র আবির্ভাবের দিন। সমাজে অন্যায়, অবিচার আর শোষণের জরাজীর্ণতার বিরুদ্ধে যিনি কলম ধরেছিলেন, আজ সেই কাজী নজরুল ইসলামের জন্মতিথি। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়ে বাঙালি হৃদয়ে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়েছিলেন এই কবি। যাঁর কলমের খোঁচায় একদা ব্রিটিশ শাসকের গদি নড়ে উঠেছিল, বর্তমান বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা শোষণ আর শাসকের নীরব চাটুকারিতার আবহে তাঁর সৃষ্টি আজও প্রাসঙ্গিক ও শক্তিশালী।

সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বনাম মানুষের জয়গান

চারিদিকে যখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে, তখন নজরুলের অসাম্প্রদায়িক কণ্ঠস্বর পরম আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। নজরুলের চেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক কণ্ঠ সারা ভারতে বিরল। তিনি একাধারে শ্যামাসংগীত ও ইসলামিক গজল লিখে প্রমাণ করেছিলেন মানুষের আবেগ ও সংগীতের ভিত্তি কোনো ধর্ম হতে পারে না। কবি স্পষ্ট লাইনে গেয়েছেন, ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’। ক্ষমতার অন্ধমোহে মত্ত এই পৃথিবীতে তাঁর কবিতা নারী-পুরুষ কিংবা ধর্মের সব বৈষম্য ঘুচিয়ে দেয়। রাজনীতি যখন যুগে যুগে ক্ষমতার সমীকরণ আর সাধারণ মানুষের অধিকার যখন শুধু সাদা চিরকুটের অক্ষরে বন্দি, তখন নজরুলের কলম ও কণ্ঠ পাল্টা তরবারি হয়ে কাজ করে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্রিটিশ সরকারের চাটুকার শ্রেণির ছিলেন না, তাই শোষকদের বিনাশ চেয়ে তিনি লিখতে পেরেছিলেন অমোঘ পঙ্ক্তি।

বিদ্রোহী চেতনার পুনর্জাগরণ ও বহুমুখী সত্ত্বা

নজরুলের জন্মতিথি তাই শুধু কবিতা আর গানে উদযাপনের প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেতনাকে নিজের মধ্যে ধারণ করার দিন। ব্রিটিশ সরকার কবিকে দেশদ্রোহী অপবাদ দিয়ে জেলে রাখলেও তাঁর সাহস দমে যায়নি। রাজবন্দীর জবানবন্দীতে কারাগারে বসেই তিনি বুক চিতিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন। তবে এই বিদ্রোহী আত্মার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক পরম প্রেমিক সত্ত্বা। যিনি এক হাতে বুলেটের মতো কলম ছুটিয়েছেন, তিনিই আবার অপর হাতে বীণা তুলে নিয়ে লিখেছেন ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’। তাঁর দোলনচাঁপা বা ছায়ানট কাব্যের মধ্যে আদ্যোপান্ত এক প্রেমিক কবিকে খুঁজে পাওয়া যায়। একই সাথে শিশুদের জন্যও তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য কালজয়ী কবিতা। মানুষের দুঃখে যিনি নিজেই ‘দুখু মিঞা’, সেই নজরুলের দর্শন বর্তমান সমাজব্যবস্থায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ার এক অনন্য হাতিয়ার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *