ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, পদ্মায় ব্যারেজ নির্মাণের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত কি বিএনপির রাজনৈতিক দম্ভ

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, পদ্মায় ব্যারেজ নির্মাণের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত কি বিএনপির রাজনৈতিক দম্ভ

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, যার অধিকাংশ নদীর উৎসই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। ফলে অভিন্ন নদীর জল বণ্টন সমস্যা নিরসনে সর্বদা উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা জল বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ চলতি বছরেই শেষ হতে চলেছে। এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, গঙ্গার চুক্তি নবায়ন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সম্মতির ওপর। এই জটিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মায় কৃত্রিম ব্যারেজ বা বাঁধ নির্মাণের আকস্মিক ঘোষণা একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সঙ্গে সুষম চুক্তি ছাড়া এমন মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ভারতের অবস্থান

অতীতে গঙ্গা জল বণ্টন চুক্তির সময়ে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকার একাধিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং জামায়াত নেতাদের ভারতবিরোধী বিভিন্ন মন্তব্য ও পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনার কারণে দিল্লির মনোভাব কতটা ইতিবাচক থাকবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ভারতের ফেডারেল কাঠামো অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের সম্মতি ছাড়া কেন্দ্র এককভাবে জল বণ্টন চুক্তি কার্যকর করতে পারে না। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে এবং ভারতের সঙ্গে কোনো বাস্তবমুখী চুক্তিতে না পৌঁছে হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পরিবেশগত বিপর্যয়

ক্ষমতায় আসার পরপরই বর্তমান সরকার মেগা প্রকল্পকে ‘দুর্নীতির উৎস’ আখ্যা দিয়ে কোনো বড় প্রকল্প না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে সরে এসে হঠাৎ করেই পদ্মায় ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪,৪৯৭ কোটি টাকা। বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বিশাল অঙ্কের অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোও এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে ঋণ সহায়তার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কাও প্রবল। ব্যারেজ বা কৃত্রিম বাঁধের কারণে নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা ও বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতীতে কাপ্তাই বাঁধের পরিবেশগত বিপর্যয় কিংবা ভারতের ফরাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট বন্যা ও নদীর নাব্যতা হ্রাসের মতো নজির রয়েছে। উজান থেকে পর্যাপ্ত জল না পাওয়া গেলে তিস্তা ব্যারেজের মতোই পদ্মা ব্যারেজও সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, লন্ডন লবির বিশেষ উৎসাহে ও স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক লাভের আশায় গৃহীত এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য আত্মঘাতী প্রমাণিত হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *