টালমাটাল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, থ্রি-এফ ফর্মুলায় ভারতের অর্থনীতি বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা নির্মলার

টালমাটাল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, থ্রি-এফ ফর্মুলায় ভারতের অর্থনীতি বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা নির্মলার

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের অর্থনীতির ওপর। এহেন বৈশ্বিক দুর্যোগের মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা ধরে রাখতে এক বিশেষ ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছে কেন্দ্র। মুম্বইয়ের এক অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে সরকার মূলত ‘৩এফ’ (3Fs) ফর্মুলাতেই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। এই তিনটি বিশেষ স্তম্ভ হলো— ফুয়েল (Fuel) বা জ্বালানি, ফার্টিলাইজার (Fertiliser) বা সার এবং ফোরেক্স (Forex) বা বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার। অর্থমন্ত্রীর মতে, আন্তর্জাতিক সংকটের এই আবহে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে যেকোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানো সম্ভব।

জ্বালানি সংকট ও রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা

পশ্চিম এশিয়ার চলমান উত্তেজনা ভারতের আমদানিনির্ভর বাজারে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমাগত ওঠানামা করছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারী দেশ হওয়ায় ঘরোয়া বাজারে জ্বালানির দামে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। ইতিমধ্যেই মে মাসে একাধিকবার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে তেল সংস্থাগুলি, যার ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহণ খরচ এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্র আবগারি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও এর ফলে সরকারের নিজস্ব আয়ে বড়সড় ধাক্কা লাগতে পারে। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে কেন্দ্রের প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্পে লিকুইডিটি সংকট দূর করার নির্দেশ

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি দেশের এমএসএমই (MSME) বা ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাত নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে এই সেক্টরের ছোট ব্যবসায়ীদের প্রায় ৮.১ লক্ষ কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ বকেয়া আটকে রয়েছে। সময়মতো এই অর্থ না পাওয়ায় কাজ চালানোর মতো প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে ধুঁকছে বহু ছোট সংস্থা। এই লিকুইডিটি বা নগদ টাকার সংকট দূর করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্র। সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে (PSU) কড়া নির্দেশ দিয়ে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ক্ষুদ্র শিল্পগুলির সমস্ত বকেয়া টাকা মিটিয়ে দিতে হবে। দ্রুত অর্থ পরিশোধ করা হলে এই সংস্থাগুলির আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং বাজারে কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ কৌশল

বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব রুখতে ভারত সরকার এখন থেকেই দূরদর্শী কৌশল অবলম্বন করছে। থ্রি-এফ ফর্মুলা কার্যকরের পাশাপাশি বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার শক্তিশালী রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত, দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে যাওয়া রুখতে সোনা আমদানি কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর করা আবেদনকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল হলেও দেশের অর্থনীতি নিয়ে অযথা আতঙ্ক ছড়াতে নিষেধ করেছেন তিনি। ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনও যথেষ্ট মজবুত অবস্থানে রয়েছে এবং ভয় না পেয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সাবধানে পা ফেলাই এখন কেন্দ্রের প্রধান লক্ষ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *