ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি ছিলেন গণতন্ত্র হত্যাকারী পাক জেনারেল! জানুন বিস্ময়কর ইতিহাস

নিজের দেশে দুবার গণতন্ত্রকে হত্যা করা এবং ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নীল নকশা তৈরি করা প্রতিবেশী দেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান কি কখনও আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবসের মঞ্চে প্রধান অতিথি হতে পারেন? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ভারতের ইতিহাসের পাতায় এমন এক বিতর্কিত অধ্যায় রয়েছে।
নেহরুর আমন্ত্রণে রাজপথে পাক গভর্নর জেনারেল
আজ থেকে ৭১ বছর আগে, ১৯৫৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সরকার পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মালিক গোলাম মুহাম্মদকে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে যখন দুদেশের মধ্যে টানাপোড়েন তুঙ্গে, সেই সময়েই রাজপথের (বর্তমান কর্তব্য পথ) ভিভিআইপি আসনে বসেছিলেন এই পাক প্রশাসক।
কে এই মালিক গোলাম মুহাম্মদ?
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গোলাম মুহাম্মদ ব্রিটিশ আমলে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ইন্ডিয়ান রেলওয়ে অ্যাকাউন্টস সার্ভিসের পদস্থ কর্তা ছিলেন। এমনকি দেশভাগের আগে তিনি হায়দ্রাবাদের নিজামের আর্থিক উপদেষ্টাও ছিলেন। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানের প্রথম অর্থমন্ত্রী এবং ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী খানের হত্যার পর তিনি দেশটির গভর্নর জেনারেল হন।
পাকিস্তানে দুবার অভ্যুত্থান ও স্বৈরাচার
মালিক গোলাম মুহাম্মদ পাকিস্তানে গণতন্ত্রকে কণ্ঠরোধ করার কারিগর হিসেবে পরিচিত:
- ১৯৫৩ সাল: প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন সরকারকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করেন।
- ১৯৫৪ সাল: নিজের ক্ষমতা অটুট রাখতে গণপরিষদ ভেঙে দেন।এই সমস্ত ষড়যন্ত্রে তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন জেনারেল আইয়ুব খান, যিনি পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।
১৯৫৫: প্রজাতন্ত্র দিবসের ঐতিহ্যে বিবর্তন
বিতর্কিত অতিথি থাকা সত্ত্বেও ১৯৫৫ সালের প্রজাতন্ত্র দিবস ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই বছর থেকেই আজকের আধুনিক কুচকাওয়াজের অনেক প্রথা শুরু হয়:
- স্থায়ী ভেন্যু (রাজপথ): ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কুচকাওয়াজ লাল কেল্লা বা রামলীলা ময়দানে হতো। ১৯৫৫ সালেই প্রথম রাজপথকে (কর্তব্য পথ) কুচকাওয়াজের স্থায়ী স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
- সামরিক আস্ফালন: ১৯৫৫ সাল থেকেই তিন বাহিনীর প্রধানদের নেতৃত্বে পূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজ এবং বিমান বাহিনীর বর্ণাঢ্য ফ্লাইপাস্ট শুরু হয়।
- সাংস্কৃতিক ট্যাবলো: আগে কুচকাওয়াজ কেবল সামরিক শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৫৫ সাল থেকেই বিভিন্ন রাজ্যের সংস্কৃতি তুলে ধরে বর্ণময় ট্যাবলো বা সুসজ্জিত প্রদর্শনী শুরু হয়।
বিস্ময়কর এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সময়ের আবর্তে ভারতের জাতীয় উদযাপনের মঞ্চেও একদা স্থান পেয়েছিলেন চরম বিতর্কিত ব্যক্তিত্বরা।