হাতে নার্সিং ডিগ্রি তবুও ১৫০০ টাকার লাইনে শিক্ষিত বেকাররা! কাজ চাই ভাতা নয় স্লোগানে কাঁপছে বাংলা

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের আবেদন ঘিরে এক অভূতপূর্ব এবং করুণ ছবি ধরা পড়ল রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে। যে প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বেকার যুবক-যুবতীদের সাময়িক স্বস্তি দেওয়া, সেই প্রকল্পের ফর্ম তুলতেই এখন উপচে পড়ছে হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর ভিড়। তবে এই ভিড় আনন্দের নয়, বরং একরাশ হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের। ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থীর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার এই দৃশ্য যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে রাজ্যের বর্তমান কর্মসংস্থান সংকটের গভীরতা।
ডিগ্রি আছে কিন্তু দিশা নেই
মহিষাদলের আবেদন কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ২০২১ সালের বিএসসি নার্সিং গ্র্যাজুয়েট কেয়া জানাকে। কারিগরি শিক্ষা এবং একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হওয়া সত্ত্বেও মেলেনি সরকারি স্থায়ী চাকরি। কেয়ার কথায়, “আমার ডিগ্রি আছে, দক্ষতাও আছে, কিন্তু নিয়োগ কোথায়? কতদিন আর শুধু পরীক্ষা দিয়ে যাব? এই ১৫০০ টাকা হাতখরচ চালাতে হয়তো কাজে দেবে, কিন্তু এটা কি আমার ভবিষ্যৎ? আমাদের দয়া নয়, স্থায়ী কাজ দরকার।” এই ক্ষোভ কেবল কেয়ার একার নয়, রাজ্যের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কারিগরি ও সাধারণ স্নাতকদের।
ভাতা বনাম মর্যাদা
কাটোয়ায় এক বৃদ্ধা মা যখন তাঁর বিটেক পাশ ছেলের জন্য যুবসাথীর ফর্ম তুলছিলেন, তখন তাঁর দু’চোখ বেয়ে জল ঝরছিল। বহু কষ্টে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়ে আজ বেকার ভাতার লাইনে দাঁড়াতে হবে, তা হয়তো তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে এই প্রকল্পের ঘোষণা করেছিলেন, যেখানে মাধ্যমিক পাশ বেকারদের মাসে ১৫০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এই টাকা ঢোকা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু আবেদনকারীদের বড় অংশের দাবি, বর্তমান বাজারে দিনে ৫০ টাকা দিয়ে কী হয়? বেহালা থেকে রায়গঞ্জ— সর্বত্রই এখন একটাই আওয়াজ উঠছে, “১৫০০ টাকার ভিক্ষা চাই না, ১৫ হাজার টাকার সম্মানজনক কাজ চাই।”
নির্বাচনী আবহে কর্মসংস্থানের প্রশ্ন
রাজ্য যখন সামনের নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখন প্রতিটি আবেদন কেন্দ্রে জমা হওয়া এই জনস্রোত সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে দাবি করা হলেও, বিরোধীরা একে ‘বেকারত্বের সেলিব্রেশন’ বলে কটাক্ষ করছে। উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজের এই মরিয়া ভাব স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, শুধুমাত্র ভাতা দিয়ে শিক্ষিত যুবশক্তির ক্ষোভ প্রশমন করা কঠিন। তাঁদের আসল দাবি— শিল্পায়ন আর স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া। আপাতত ১৫০০ টাকার ভাতার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ডিগ্রিধারীদের চোখেমুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সেই আশঙ্কাই প্রকট হয়ে উঠছে।