ট্রাম্পের রণতরী কি পাঠাবে ইরানকে সমুদ্রের তলদেশে? মধ্যপ্রাচ্যে ঘনিয়ে আসছে মহাপ্রলয়ের সংকেত

ট্রাম্পের রণতরী কি পাঠাবে ইরানকে সমুদ্রের তলদেশে? মধ্যপ্রাচ্যে ঘনিয়ে আসছে মহাপ্রলয়ের সংকেত

নিউজ ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ফের ঘনিয়ে আসছে বারুদের গন্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক চরম উত্তেজনার শিখরে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে দুই দেশের এই সংঘাত যেকোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। ওয়াশিংটনের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার ২.০’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি তেহরানকে কার্যত এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও আমেরিকার সমর প্রস্তুতি

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেছেন। তার সাফ কথা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানকে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ মুখোমুখি হতে হবে। এই হুমকি কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; মার্কিন পেন্টাগন সূত্রে খবর, মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইতিমধ্যে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব এবং বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’ ও ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ বর্তমানে ওই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর পাশাপাশি কয়েক ডজন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম বি-টু স্টিলথ বোমারু বিমানকেও উচ্চ সতর্কতায় (High Alert) রাখা হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ইরানি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্পের সেই রহস্যময় ‘সহায়তা আসছে’ বার্তার পর থেকেই মূলত এই সামরিক তৎপরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লিভিট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও সামরিক অভিযানের বিকল্পটি ট্রাম্পের টেবিলে সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।

জেনেভা আলোচনা ও অমীমাংসিত সংকট

রণসজ্জার সমান্তরালে কূটনৈতিক স্তরেও কিছু নড়াচড়া দেখা গেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জেনেভায় ওমানি দূতের বাসভবনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই বৈঠককে ‘একটি ভালো শুরু’ বলে বর্ণনা করলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের সুর ছিল ভিন্ন। তাদের মতে, দুই দেশের দাবির মধ্যে এখনো ‘বিশাল ব্যবধান’ রয়ে গেছে যা ঘোচানো প্রায় আসাম্ভব।

ট্রাম্প প্রশাসনের মূল দাবিগুলো হলো

  • ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
  • নিজেদের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম থেকে সরে আসতে হবে।
  • মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান বন্ধ করতে হবে।

অন্যদিকে, ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব এবং আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কোনো ধরনের আপস করতে নারাজ। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ইরানকে এই দাবিগুলো মানার জন্য ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত একটি অলিখিত সময়সীমা বা ‘ডেডলাইন’ বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

ইরানের পাল্টা প্রস্তুতি ও অক্ষশক্তির উত্থান

আমেরিকার এই নজিরবিহীন সামরিক চাপের মুখে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন যে, মার্কিন নৌবাহিনীকে ‘সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার’ পর্যাপ্ত ক্ষমতা ইরানের রয়েছে। এই শক্তির জানান দিতেই ইরান, রাশিয়া এবং চীন উত্তর আরব সাগরে এক বিশাল যৌথ নৌ-মহড়া শুরু করেছে। একে আমেরিকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী পাল্টাবার্তা হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।

স্মর্তব্য যে, গত বছর ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে ইরানর পারমাণবিক স্থাপনায় আমেরিকার যে হামলা হয়েছিল, তার ক্ষোভ এখনো ইরান ভুলতে পারেনি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইজরায়েলের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তেল আবিবও ইরানের ওপর বড়সড় হামলার নীল নকশা চূড়ান্ত করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে আগামী কয়েক দিন বা সপ্তাহ বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংকটময়। মধ্যপ্রাচ্য কি সত্যিই আরও একটি রক্তক্ষয়ী ধ্বংসলীলার পথে হাঁটবে, নাকি শেষ মুহূর্তে কূটনীতির জাদুতে এড়িয়ে যাওয়া যাবে এই মহাপ্রলয়, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের পারদ চড়ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *