৮ বছরে ২০ বার অপমানের শিকার, ভিনিসিয়াস কবে পাবেন বিচার?

ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাস যেন বারবার কলঙ্কিত হচ্ছে বর্ণবিদ্বেষের বিষাক্ত ছোবলে। লিসবনের এস্তাদিও দা লুজে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ প্লে-অফের হাইভোল্টেজ ম্যাচে আবারও সেই চেনা এবং নক্কারজনক দৃশ্য। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ওপর গ্যালারি থেকে ধেয়ে এল বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য। দীর্ঘ ১০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকল। বেনফিকা বনাম রিয়াল মাদ্রিদ দ্বৈরথ ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে ফুটবলের অন্ধকার এই অধ্যায়। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর থেকে গত আট বছরে এটি ভিনিসিয়াসের করা ২০ নম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ। প্রশ্ন উঠছে, আর কতবার?
লিসবনের সেই উত্তপ্ত রাত এবং বেনফিকা বিতর্ক
ম্যাচ চলাকালীন ভিনিসিয়াস গোল করার পরপরই পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে শুরু করে। ভিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে লক্ষ্য করে গ্যালারি থেকে কুরুচিকর এবং বর্ণবিদ্বেষী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযুক্ত হিসেবে নাম উঠে এসেছে জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানির। যদিও প্রেস্তিয়ানি সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ শিবির তাদের অবস্থানে অনড়। কিলিয়ান এমবাপে স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি নিজেও কানে অন্তত পাঁচবার সেই কদর্য মন্তব্য শুনেছেন। তবে বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছেন বেনফিকা কোচ জোসে মোরিনহো। ভিনিসিয়াসের আচরণের দিকে আঙুল তুলে তিনি দাবি করেছেন, গোল পরবর্তী উদযাপন আরও ‘সম্মানজনক’ হওয়া উচিত ছিল। এই মন্তব্য ফুটবল বিশ্বে নতুন তর্কের জন্ম দিয়েছে—একজন ভুক্তভোগীর প্রতিবাদ কি তবে তাঁর আচরণের দোহাই দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হবে?
আট বছরের দীর্ঘ লাঞ্ছনার ইতিহাস
২০২১ সালে ন্যু ক্যাম্পে বার্সেলোনার বিরুদ্ধে এল ক্লাসিকো থেকে এই যন্ত্রণার শুরু। এরপর ২০২২-এ মায়োরকা সমর্থকদের ‘বানর-ডাক’, এমনকি স্প্যানিশ টেলিভিশনেও তাঁকে নিয়ে করা বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। ২০২৩ সালের শুরুতে আতলেতিকো মাদ্রিদ সমর্থকদের ভিনিসিয়াসের জার্সি পরানো কুশপুত্তলিকা ব্রিজে ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ছিল চরম অমানবিক। ভ্যালেন্সিয়ার মাঠে ২০২৩ সালে যখন তিনি সরাসরি গ্যালারির দিকে আঙুল তুললেন, তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনায় স্পেনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন সমর্থককে জেল খাটতে হয়েছে। কিন্তু তবুও কি পরিস্থিতি বদলেছে? ওসাসুনার মাঠে ‘ভিনিসিয়ুস ডাই’ স্লোগান কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাগাতার ঘৃণা-প্রচার প্রমাণ করে সমস্যাটি কতটা গভীরে প্রোথিত।
প্রতিবাদের মুখ এবং প্রশাসনের ভূমিকা
ভিনিসিয়াস জুনিয়র এখন আর কেবল একজন স্কিলফুল উইঙ্গার নন, তিনি বর্ণবাদ বিরোধী লড়াইয়ের বৈশ্বিক আইকন। ২০২৪ সালে তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন, “আমি বর্ণবাদের শিকার নই, আমি বর্ণবাদীদের শত্রু।” তাঁর এই অবস্থান লা লিগা এবং উয়েফাকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে। অনেক সমাজবিজ্ঞানী একে ‘রেসিজম উইদাউট রেসিস্টস’ বলে ব্যাখ্যা করছেন, যেখানে অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীর প্রতিক্রিয়াকেই বড় করে দেখা হয়। সমালোচকরা তাঁর মাঠের মেজাজ নিয়ে কথা বললেও, দিনের পর দিন মানসিক নিপীড়নের শিকার হওয়া একজন ফুটবলারের প্রতিক্রিয়া যে স্বাভাবিক, তা মানছেন ফুটবল বোদ্ধাদের বড় অংশ।
উয়েফা প্রোটোকল অনুযায়ী ম্যাচ থামছে, ঘোষণা হচ্ছে, তদন্তও হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই তদন্ত কি পরবর্তী ২১তম অভিযোগ রুখতে সক্ষম? ফুটবল প্রশাসন কি সত্যিই ভিনিসিয়াসের পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়াবে, নাকি কেবল নিয়ম রক্ষার খাতিরেই চলবে এই বিচারের প্রহসন? ভিনিসিয়াসের এই একক সংগ্রাম এখন গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের বিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।