রামকৃষ্ণদেবকে ‘স্বামী’ সম্বোধন মোদীর, বঙ্কিমদা বিতর্কের পর এবার ব্যাকরণ ভুলে প্রধানমন্ত্রীর ক্লাস নিলেন মমতা

বাংলার মণীষীদের নাম কি তবে ঠিকমতো জানেন না দেশের প্রধানমন্ত্রী? বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে ‘স্বামী’ সম্বোধন করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়লেন নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রীর এই ‘সাংস্কৃতিক অজ্ঞতা’ নিয়ে এবার সরাসরি রণংদেহী মেজাজে আসরে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন, বাংলার আবেগ আর ইতিহাসের পাঠ প্রধানমন্ত্রীর আরও ভালো করে নেওয়া উচিত।
রামকৃষ্ণ জন্মতিথিতে মোদীর বিতর্কিত পোস্ট
বৃহস্পতিবার সকালে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের জন্মতিথি উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। হিন্দিতে লেখা সেই পোস্টে তিনি শ্রী রামকৃষ্ণকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তাঁর নামের আগে ‘স্বামী’ শব্দটি ব্যবহার করেন। মোদী লেখেন, “স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। আধ্যাত্মিক সাধনায় তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
প্রধানমন্ত্রী ভক্তিভরে পোস্টটি করলেও বিপত্তি বাধে ওই ‘স্বামী’ শব্দটি নিয়ে। রামকৃষ্ণ অনুরাগী থেকে শুরু করে সাধারণ বাঙালি— প্রত্যেকেরই জানা যে, রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে ‘স্বামী’ উপসর্গ ব্যবহার করা হলেও স্বয়ং শ্রী রামকৃষ্ণকে সবসময় ‘ঠাকুর’ বা ‘পরমহংসদেব’ হিসেবেই সম্বোধন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই শব্দচয়ন ঘিরেই শুরু হয় বিতর্ক।
ক্ষুব্ধ মমতার কড়া প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রীর এই পোস্ট নজরে আসতেই দেরি করেননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডেলে পাল্টা পোস্ট করে তিনি মোদীকে রীতিমতো তুলাধোনা করেন। মমতা লেখেন, “আমি আবারও স্তম্ভিত! আমাদের প্রধানমন্ত্রী বারবার বাংলার মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি তাঁর সাংস্কৃতিক অসংবেদনশীলতা প্রদর্শন করছেন। আজ যুগাবতার শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মতিথি। অথচ তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর নামের আগে অভূতপূর্ব এবং অনুপযুক্ত ‘স্বামী’ উপসর্গ যোগ করেছেন।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে মনে করিয়ে দেন যে, রামকৃষ্ণ ঐতিহ্যে ‘ঠাকুর-মা-স্বামীজি’ হলেন পবিত্র ত্রিমূর্তি। ঠাকুর হলেন শ্রী রামকৃষ্ণ, মা হলেন সারদা দেবী এবং স্বামীজি হলেন বিবেকানন্দ। রামকৃষ্ণদেবের শিষ্যরা ‘স্বামী’ হলেও স্বয়ং গুরুকে কখনও এই নামে ডাকা হয় না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে মমতার বিনীত কিন্তু কড়া অনুরোধ, “আধুনিক ভারত গঠনকারী বাংলার মণীষীদের জন্য দয়া করে নতুন নতুন উপসর্গ বা প্রত্যয় আবিষ্কার করবেন না।”
ফিরে এল ‘বঙ্কিমদা’ স্মৃতি
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অতীত ভুলের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। গত বছর সংসদে দাঁড়িয়ে জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বারংবার ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন মোদী। সেই সময় তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় তাঁর ভুল ধরিয়ে দিলে প্রধানমন্ত্রী লজ্জিত হয়ে তা সংশোধন করে ‘বঙ্কিমবাবু’ বলেন। কিন্তু বাংলার মণীষীদের নিয়ে বারবার প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের ভুলকে কোনোভাবেই লঘু করে দেখতে নারাজ তৃণমূল শিবির।
রাজনৈতিক মহলের মতে, লোকসভা নির্বাচনের আগে বাংলার সংস্কৃতি ও ভাবাবেগকে হাতিয়ার করে বিজেপিকে কোণঠাসা করার কোনো সুযোগই ছাড়তে চাইছেন না মমতা। প্রধানমন্ত্রীর এই ছোট ভুলকে বাংলার ‘অস্মিতা’র অপমান হিসেবে তুলে ধরে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন তিনি।