‘ভুল হয়েছিল’ স্বীকার করে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ প্রতীক উর রহমান

বাম শিবিরের অন্দরে কি তবে বড়সড় ভাঙনের সুর? দীর্ঘদিনের লড়াকু ছাত্রনেতা থেকে সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য, প্রতীক উর রহমানের সাম্প্রতিক পদত্যাগ এবং বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার ঘিরে এখন তোলপাড় বাংলার রাজনীতি। যে নেতা এতদিন তৃণমূল সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আচমকাই তাঁর মুখে শোনা গেল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের দরাজ প্রশংসা। রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন, লাল ঝাণ্ডা ছেড়ে প্রতীক কি তবে জোড়াফুলের পথে?
ইস্তফা ও বিস্ফোরক অভিযোগ
সোমবার সকালে প্রতীক উর রহমানের ইস্তফাপত্র সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শোরগোল শুরু হয়। সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের কাছে পাঠানো সেই চিঠিতে প্রতীক স্পষ্ট জানিয়েছেন, দলের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তিনি মানিয়ে নিতে পারছেন না। তাঁর অভিযোগ, সিপিএম ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং দলের অন্দরে গঠনমূলক আলোচনার জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে। একসময়ের তুখোড় এই যুব নেতার দাবি, সূর্যকান্ত মিশ্রর সময়ে সমালোচনা শোনার যে সংস্কৃতি ছিল, বর্তমান নেতৃত্বে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। প্রশ্ন তুললেই তাঁকে কোণঠাসা করা হয়েছে এমনকি রাজ্য সম্মেলনে ডেলিগেট পর্যন্ত করা হয়নি বলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে ডিগবাজি
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো সরকারি প্রকল্প নিয়ে প্রতীকের ভোলবদল। যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে বামেরা এতদিন ‘ভিক্ষা’ বলে কটাক্ষ করে এসেছে, সেই প্রকল্পকেই এখন ‘জনহিতকর’ বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন প্রতীক। তাঁর যুক্তি, একসময় বামেরাও ভাতা বাড়ানোর কথা বলেছিল, তাই একে কোনোভাবেই ভিক্ষা বলা যায় না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীকের এই ‘হৃদয় পরিবর্তন’ আসলে শাসক শিবিরের দিকে পা বাড়ানোর প্রথম ধাপ।
অভিষেককে চ্যালেঞ্জ জানানো নেতার নতুন গন্তব্য কোথায়
কলেজ জীবন থেকে এসএফআই করে উঠে আসা প্রতীক উর রহমান ছিলেন দলের সম্পদ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানানো কিংবা রাজপথে পুলিশের মার খেয়েও লড়াই জারি রাখা—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। সেই লড়াকু মুখ আজ কেন ‘দমবন্ধ’ হওয়ার অভিযোগ তুলছেন, তা নিয়ে অস্বস্তিতে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। সৃজন ভট্টাচার্যের মতো যুব নেতাদের গুরুত্ব না দেওয়া নিয়েও বর্তমান নেতৃত্বের দিকে আঙুল তুলেছেন তিনি।
সরাসরি যোগদানের ইঙ্গিত?
তৃণমূলে যোগ দেবেন কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেলেও সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেননি প্রতীক। তাঁর সাফ কথা, “যা করব প্রকাশ্যে করব, রাতের অন্ধকারে নয়।” তবে হুমায়ুন কবীরের মতো নেতাদের সঙ্গে সিপিএম নেতৃত্বের সখ্যতা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলের ওপর তাঁর মোহভঙ্গ হয়েছে চূড়ান্তভাবে। লোকসভা ভোটের মুখে প্রতীকের মতো একনিষ্ঠ কর্মীর দলত্যাগ এবং শাসক দলের গুণগান নিঃসন্দেহে বামেদের জন্য বড় ধাক্কা। এখন দেখার, আলিমুদ্দিনের এই ‘প্রতীক’ শেষ পর্যন্ত কালীঘাটের দরজায় গিয়ে দাঁড়ান কি না।