অঘটন নয় এটাই দস্তুর! বিশ্বকাপের মঞ্চে ‘সাইলেন্ট কিলার’ জিম্বাবোয়েকে নিয়ে কেন কাঁপছে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা

টি-২০ বিশ্বকাপের আঙিনায় জিম্বাবোয়ে মানেই এক সময় ছিল নিছকই ‘অঘটন’ ঘটানো এক দল। বড় কোনো শক্তিকে হারিয়ে ডাগ-আউটে বাঁধনহারা উল্লাস, মাঠজুড়ে দৌড়াদৌড়ি—এটাই ছিল চেনা ছবি। কিন্তু ২০২৬-এর টি-২০ বিশ্বকাপে জিম্বাবোয়ে ধরা দিয়েছে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও রহস্যময় অবতারে। অস্ট্রেলিয়া বা শ্রীলঙ্কার মতো বিশ্বশক্তিকে গুঁড়িয়ে দিয়েও সিকান্দার রাজার দলের চোখেমুখে নেই কোনো বাড়তি উন্মাদনা। জয়ের পর কেবল শান্ত ভঙ্গিতে করমর্দন করে ড্রেসিংরুমে ফেরা—এই নিস্তব্ধতাই এখন বিশ্ব ক্রিকেটের বড় দলগুলোর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিম্বাবোয়ে এখন আর ‘আন্ডারডগ’ নয়, বরং তারা হয়ে উঠেছে এক ‘পেশাদার ঘাতক’।
ধোনির মগজ আর রাজার রণকৌশল
এই পরিবর্তনের নেপথ্যে মূল কারিগর অধিনায়ক সিকান্দার রাজা। তাঁর ক্রিকেটীয় দর্শনের মধ্যে যেন মিশে আছে ২০০৮ সালের মহেন্দ্র সিং ধোনির সেই বিখ্যাত নীতি। ধোনি বিশ্বাস করতেন, জয়কে যদি অতিপ্রাকৃত বা মিরাকল মনে করে প্রবল উদ্যাপন করা হয়, তবে বোঝা যায় দল জেতার আশা করেনি। রাজা ঠিক সেই পথেই হাঁটছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৬৯ রান ডিফেন্ড করা হোক বা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৭৯ রান তাড়া—জিম্বাবোয়ের ক্রিকেটাররা দেখাচ্ছেন যে বড় দলকে হারানো এখন তাঁদের কাছে কোনো চমক নয়, বরং রুটিনমাফিক কাজের অংশ। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনই প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দিচ্ছে।
মাঠের ভেতরে নিখুঁত পরিকল্পনা ও এক্সিকিউশন
সিকান্দার রাজা নিজে ২০টি ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার জিতে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। কিন্তু এখন তিনি কেবল একজন অলরাউন্ডার নন, দলের প্রধান স্থপতি। তাঁর দলে এখন আবেগের চেয়ে পরিকল্পনার দাম বেশি। ব্লেসিং মুজারাবানির দিকে তাকালে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। বিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে স্লেজিং করে তাতানো নয়, বরং নির্দিষ্ট লাইন ও লেংথে বিষাক্ত বাউন্সারে বোকা বানানোই তাঁর কাজ। অন্যদিকে, তরুণ ব্রায়ান বেনেট যেভাবে চাপের মুখে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ইনিংস গড়েছেন, তাতে অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। জিম্বাবোয়ে এখন আর মাঠে নেমে কেবল লড়াই করার মানসিকতা রাখে না, তারা জানে কীভাবে ম্যাচ পকেটে পুরতে হয়।
সুপার এইটে টিম ইন্ডিয়ার জন্য অশনি সংকেত
গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে সুপার এইটে পা রাখা জিম্বাবোয়ে এখন ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। টিম ইন্ডিয়ার ব্যাটিং লাইন-আপের জন্য মুজারাবানির অতিরিক্ত বাউন্স মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। আবার মিডল অর্ডারে বেনেট বা রাজার ঠান্ডা মাথার ব্যাটিং যেকোনো বোলিং আক্রমণকে ছত্রখান করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো জিম্বাবোয়ের নতুন এই ‘অ্যাটিটিউড’। তারা এখন নিজেদের ক্ষমতার গভীরতা চিনে ফেলেছে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো হেভিওয়েট দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তা পরিষ্কার—এবারের জিম্বাবোয়ে কেবল অংশগ্রহণ করতে আসেনি, তারা এসেছে হিসাব কষে ট্রফি জয়ের লক্ষ্যে আঘাত হানতে। মাঠের ভেতরে তাদের এই শান্ত ও পেশাদার ভঙ্গিই বুঝিয়ে দিচ্ছে, টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত ডার্ক হর্স হিসেবে থাকতে চাইছে না রাজা বাহিনী, বরং তারা সরাসরি শিরোপার দাবিদার।