ব্যাঙ্কের লকার থেকে উধাও ৬০ লক্ষের গয়না, নাড়িয়ে দিল সুরক্ষা ব্যবস্থা

ব্যাঙ্কের লকার থেকে উধাও ৬০ লক্ষের গয়না, নাড়িয়ে দিল সুরক্ষা ব্যবস্থা

দিল্লির এক নামী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের লকার থেকে বিপুল পরিমাণ গয়না চুরির ঘটনায় রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে। লকার খুলতেই দেখেন ভেতরে কিচ্ছু নেই, অথচ লকারটি ছিল অক্ষত। এই রহস্যজনক ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে ব্যাঙ্কের লকার কতটা নিরাপদ এবং আপনার সম্পদ খোয়া গেলে ব্যাঙ্ক ঠিক কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য?

লকার কি আসলেই সুরক্ষিত? দিল্লির চাঞ্চল্যকর তথ্য

দিল্লির কীর্তি নগর শাখার পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে এই ঘটনাটি ঘটেছে। অভিযোগকারী মহিলার দাবি, তাঁর লকার থেকে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকার সোনার গয়না গায়েব হয়ে গিয়েছে। অদ্ভুত বিষয় হলো, পুলিশি তদন্তে লকারের চাবিতে বা তালাতে কোনো প্রকার কারচুপির চিহ্ন মেলেনি। এমনকি ব্যাঙ্কের সিসিটিভি ফুটেজ বা অন্যান্য রেকর্ডেও প্রাথমিক কোনো ত্রুটি ধরা পড়েনি। এই ঘটনা লকার গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই একে পারিবারিক বিবাদ বলে ধারণা করলেও, ব্যাঙ্কের সুরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর নিয়ে বিতর্ক থামছে না।

আপনার কোটি টাকার গয়না হারালে ব্যাঙ্ক দেবে মাত্র কয়েক লাখ

সাধারণ মানুষের ধারণা, ব্যাঙ্কে লকার নেওয়া মানেই ১০০ শতাংশ সুরক্ষা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বেশ ভিন্ন। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (RBI) নির্দেশিকা অনুযায়ী, লকারে রাখা জিনিসের প্রকৃত মূল্যের দায়ভার ব্যাঙ্ক গ্রহণ করে না। মুম্বইয়ের আইনি বিশেষজ্ঞ অপূর্ব আগরওয়াল জানিয়েছেন, ব্যাঙ্ক আপনার সম্পদের জামিনদার নয়, বরং একজন রক্ষক মাত্র।

চুরি বা ব্যাঙ্কের কোনো অবহেলার কারণে যদি লকারের জিনিস হারিয়ে যায়, তবে ব্যাঙ্ক সর্বাধিক আপনার বার্ষিক লকার ভাড়ার ১০০ গুণ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। ধরুন, আপনি বছরে লকার ভাড়া দেন ৪,০০০ টাকা। আপনার লকার থেকে যদি ১ কোটি টাকার গয়নাও চুরি হয়, তাহলেও নিয়ম অনুযায়ী ব্যাঙ্ক আপনাকে সর্বোচ্চ ৪ লক্ষ টাকাই দেবে। এই সীমাবদ্ধতা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বড়সড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুরক্ষায় অবহেলা হলে আইনি পথ কী

লকার থেকে সম্পদ খোয়া গেলে চুপ করে বসে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। গ্রাহকদের কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি অধিকার রয়েছে:

  • এফআইআর ও তদন্ত: সম্পদ হারানো মাত্রই নিকটস্থ থানায় এফআইআর দায়ের করতে হবে এবং ব্যাঙ্কের কাছে সঠিক তদন্তের দাবি জানাতে হবে।
  • সিসিটিভি ও রেকর্ড: ব্যাঙ্কের দায়িত্ব হলো সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড গ্রাহক বা তদন্তকারী সংস্থার কাছে পেশ করা।
  • ক্রেতা সুরক্ষা আদালত: যদি প্রমাণিত হয় যে ব্যাঙ্কের গাফিলতি বা নিরাপত্তার অভাবের কারণে এই চুরি হয়েছে, তবে গ্রাহক উচ্চতর ক্ষতিপূরণের দাবিতে দেওয়ানি আদালত বা কনজিউমার ফোরামের দ্বারস্থ হতে পারেন।

ভবিষ্যতে বড় ক্ষতি এড়াতে যা করবেন

ব্যাঙ্ক লকার সাধারণত নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য বিশেষজ্ঞরা তিনটি প্রধান পরামর্শ দিচ্ছেন:

১. লকার বিমা: আইএফএফসিও টোকিওর মতো সংস্থাগুলি এখন বিশেষ লকার প্রোটেক্টর পলিসি প্রদান করে। এটি চুরি, আগুন এমনকি ব্যাঙ্কের কর্মীদের বিশ্বাসঘাতকতা থেকেও আপনার গয়নাকে আর্থিক সুরক্ষা দেয়।

২. নথিপত্র গুছিয়ে রাখা: লকারে কী কী গয়না রাখছেন তার একটি বিস্তারিত তালিকা, ছবি এবং গয়না কেনার বিল বা মূল্যায়ন শংসাপত্র নিজের কাছে রাখুন। আইনি লড়াই বা বিমা দাবির ক্ষেত্রে এগুলিই হবে আপনার প্রধান হাতিয়ার।

৩. নিয়মিত লকার পরিদর্শন: লকার নিয়ে ফেলে না রেখে অন্তত কয়েক মাস অন্তর ব্যাঙ্কে গিয়ে লকার চেক করা এবং ব্যাঙ্কের নথিতে স্বাক্ষর করা জরুরি।

দিল্লির এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, স্রেফ ব্যাঙ্কের ওপর ভরসা না করে নিজের মূল্যবান সম্পদের বিমা এবং সঠিক ডকুমেন্টেশন রাখা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *