রক্তে রাঙানো একুশ যেভাবে বিশ্বজয় করল সেই ইতিহাস শিহরণ জাগাবে আপনার মনে

১৯৪৭ সালে দেশভাগের ক্ষত যখন দাউদাউ করে জ্বলছে, ঠিক তখনই পূর্ব বাংলার সাড়ে চার কোটি মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার এক নীল নকশা তৈরি হয়। করাচির জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাস হতেই উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া এবং মুদ্রার নোট ও স্ট্যাম্প থেকে বাংলা অক্ষর মুছে ফেলার ধৃষ্টতা মেনে নেয়নি প্রতিবাদী ছাত্র সমাজ। তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেমের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই স্ফুলিঙ্গ দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে।
উর্দুর আগ্রাসন ও বাঙালির আপসহীন লড়াই
তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান যখন উর্দুকে একচ্ছত্র আধিপত্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন ১৯৪৮ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররা জানিয়ে দিয়েছিল— ‘বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা’। ১৯৫৪ সালের ৭ মে মুসলিম লীগের সমর্থনে গণপরিষদে বাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে মর্যাদা পেলেও লড়াই থামেনি। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সংবিধানে ২১৪ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উর্দু ও বাংলাকে সমান মর্যাদা দিতে বাধ্য হয় শাসকরা। কিন্তু আইয়ুব খানের সামরিক জান্তা ফের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে আন্দোলন এক নতুন মাত্রা পায়।
একুশে ফেব্রুয়ারির সেই রক্তাক্ত দুপুর
১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ ফাল্গুন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার রাজপথ রফিক, জব্বার, শফিউল, সালাম ও বরকতের তাজা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের গুলিতে তরুণ প্রাণগুলোর আত্মত্যাগ কেবল একটি ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং জন্ম দিয়েছিল এক নতুন জাতীয়তাবাদের। এই গণহত্যার স্মৃতি অম্লান রাখতে নির্মিত হয় শহীদ মিনার, যা আজ বাঙালির অদম্য সাহসের প্রতীক।
আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলা
ভাষার জন্য এই আত্মত্যাগের মহিমা কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহারের মানভূম এবং ১৯৬১ সালে আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা রক্ষার লড়াই নতুন ইতিহাস লেখে। বাঙালির এই দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২৮টি দেশের সমর্থনে পাস হওয়া এই প্রস্তাবটি ২০১০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক বিশ্বব্যাপী পালনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
আজ পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকা থেকে শুরু করে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ— বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে এই দিনটি কেবল শোকের নয়, বরং পরম গৌরবের। একুশ মানেই আজ নিজের শেকড়কে চেনার দিন, একুশ মানেই মায়ের ভাষায় কথা বলার চিরন্তন অধিকার।