আগরতলায় অমিত শাহের বড় ঘোষণা, হিন্দি বনাম আঞ্চলিক ভাষা বিতর্ক নিয়ে যা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আগরতলা
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে হিন্দি ভাষার সঙ্গে ভারতের কোনো আঞ্চলিক বা স্থানীয় ভাষার বিন্দুমাত্র লড়াই নেই। শুক্রবার বিকেলে আগরতলার হাঁজলয়ায় আয়োজিত এক যৌথ আঞ্চলিক রাজভাষা সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তাঁর মতে, হিন্দি এবং স্থানীয় ভাষা—উভয়ই দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সব ভাষার সমন্বয়ই ভারতকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাবে।
মাতৃভাষার গুরুত্ব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বান
অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ আবেদন জানিয়ে অমিত শাহ বলেন, সন্তানদের সঙ্গে বাড়িতে অবশ্যই মাতৃভাষায় কথা বলা উচিত। তিনি সতর্ক করে দেন যে, নতুন প্রজন্ম যদি নিজের ভাষা শিখতে বা লিখতে না পারে, তবে তারা অচিরেই নিজেদের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “স্বরাজ মানে কেবল নিজের শাসন নয়, স্বরাজ হলো স্বভাষা ও স্বধর্ম।” সংবিধান প্রণেতারা শিবাজীর এই আদর্শ মেনেই হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লিপি বিতর্ক ও ত্রিপুরার প্রেক্ষাপট
ত্রিপুরায় দীর্ঘদিনের লিপি বিতর্ক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি উত্তর-পূর্বের জনজাতি গোষ্ঠীগুলোকে দেবনাগরী লিপি গ্রহণের আহ্বান জানান। তাঁর যুক্তি, একটি সুসংহত লিপি ব্যবস্থা থাকলে ভাষার বিকাশ ও প্রশাসনিক কাজ সহজ হয়। উল্লেখ্য, বর্তমানে ত্রিপুরার রাজনীতিতে ককবরক ভাষার লিপি নিয়ে শাসক দল বিজেপি এবং তাদের জোটসঙ্গী তিপ্রা মথার মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিজেপি দেবনাগরীর পক্ষে সওয়াল করলেও তিপ্রা মথা রোমান লিপির দাবিতে অনড়। শাহের এই মন্তব্য সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করল।
শান্তি ও উন্নয়নের পথে উত্তর-পূর্ব
২০১৪ সালের আগের ও পরের পরিস্থিতির তুলনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন ‘বিবাদের অঞ্চল’ থেকে ‘বিকাশের অঞ্চলে’ পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে ২১টি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং প্রায় ১১ হাজার যুবক অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। এই শান্তির বাতাবরণেই পর্যটন ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন
অমিত শাহ তাঁর বক্তব্যে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, শচীন দেববর্মণ, রাহুল দেববর্মণ, ভূপেন হাজারিকা, জুবিন গর্গ এবং ড্যানি ডেনজংপার মতো গুণী শিল্পীরা হিন্দি ভাষার মাধ্যমেই সারা ভারতে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এর পাশাপাশি মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিআর আম্বেদকরের অবদানের কথাও তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেন।
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার বক্তব্য
অনুষ্ঠানে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ডা.) মানিক সাহা বলেন, ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে একসূত্রে বাঁধার শক্তিশালী মাধ্যম হলো হিন্দি। তিনি মনে করেন, আঞ্চলিক ভাষার স্বকীয়তা বজায় রেখেই হিন্দির প্রসার ঘটানো উচিত। প্রধানমন্ত্রী মোদি বিশ্বমঞ্চে হিন্দিতে ভাষণ দিয়ে যেভাবে ভারতীয় ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী তারও ভূয়সী প্রশংসা করেন।
এই সম্মেলনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বানডি সঞ্জয় কুমার, সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব, কৃতিদেবী সিং দেববর্মণ সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় তিন হাজার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠানটি ত্রিপুরার ভাষাগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে রইল।