শহীদ মিনারে মোনাজাত ও জামায়াত আমিরের উপস্থিতি ঘিরে একুশের প্রথম প্রহরে নয়া ইতিহাস

ঢাকা: ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পর এক অনন্য ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ২০২৬ সালের একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রথাগত আচারের সঙ্গে যুক্ত হলো ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নতুন সমীকরণ। এবারই প্রথম দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিলেন তারেক রহমান। অন্যদিকে, দীর্ঘ কয়েক দশকের প্রথা ভেঙে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদীয় বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা ও বিশেষ মোনাজাত
রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ১২টা ৮ মিনিটে শহীদ মিনারের বেদিতে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তবে এবারের বিশেষত্ব ছিল শ্রদ্ধা নিবেদন পরবর্তী দোয়া অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ভাষা শহীদদের পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সাম্প্রতিক চব্বিশের গণআন্দোলনে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
বাসস জানিয়েছে, এই মোনাজাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্যও দোয়া করা হয়। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে পারিবারিকভাবেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
জামায়াত আমিরের ঐতিহাসিক উপস্থিতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের একুশে ফেব্রুয়ারির সবচেয়ে বড় চমক ছিল জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের শহীদ মিনারে আগমন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে তিনি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং বেদিতে দাঁড়িয়ে মোনাজাত পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল বেদিতে এসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়নি।
উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে রাষ্ট্রীয় আচার পালন করা আমার দায়িত্ব। আমরা বায়ান্ন থেকে শুরু করে একাত্তর, নব্বই এবং গত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহীদ হওয়া সবাইকে সমানভাবে শ্রদ্ধা করি। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ আমাদের কাছে চিরস্মরণীয়।”
নিরাপত্তা ও অন্যান্য দলের শ্রদ্ধা
তিন বাহিনীর প্রধানদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় সর্বস্তরের মানুষের জন্য। তবে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় জাতীয় পার্টির একটি প্রতিনিধি দল বাধার মুখে পড়ে বলে অভিযোগ উঠেছে। একটি রাজনৈতিক দলের ইউনিটের নেতাকর্মীদের বাধার কারণে তারা ব্যানারসহ মূল বেদিতে পৌঁছাতে বেগ পান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় এ বছর ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিশ্ছিদ্র পাহারায় কয়েক লাখ মানুষ সারিবদ্ধভাবে ভাষা শহীদদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ঢাকার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা সদরেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে।