সিপিএমের ঘর ভেঙে আমতলায় অভিষেক-ম্যাজিক, প্রতীক-উরকে হারানো কি সেলিমের ‘সন্তান শোক’

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য রাজনীতিতে কার্যত ভূমিকম্প। দীর্ঘদিনের লড়াকু বাম মুখ, এসএফআই-এর প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি প্রতীক-উর রহমান লাল পতাকা ছেড়ে ঘাসফুল শিবিরে নাম লেখাতে চলেছেন। শনিবার আমতলায় খোদ তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তাঁর এই দলবদল কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং ছাব্বিশের ভোটের আগে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের জন্য এক বিরাট ধাক্কা হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল।
লাল দুর্গে ভাঙন এবং তৃণমূলের চাল
ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে একসময় অভিষেকের বিরুদ্ধে বামেদের বাজি ছিলেন এই তরুণ তুর্কি। সেই প্রতীক-উরই এখন তৃণমূলের সৈনিক হতে চলায় জল্পনা তুঙ্গে। রাজনৈতিক অন্দরের খবর, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হতে পারেন তিনি। সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্যপদ থেকে তাঁর ইস্তফা এবং তারপরের এই ভোলবদল বামেদের তরুণ প্রজন্মের কর্মীদের মধ্যে যথেষ্ট হতাশা তৈরি করেছে।
‘সন্তান হারানোর বেদনা’ মোহাম্মদ সেলিমের আবেগঘন বয়ান
প্রতীক-উরের দলবদল নিয়ে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম যে তীব্র মনকষ্টে আছেন, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। রাজ্য কমিটির বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সেলিম সরাসরি নাম না নিলেও ‘সন্তান হারানোর’ রূপক ব্যবহার করে নিজের যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আজ প্রতীক-উরের যে ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হয়েছে, সেটা সিপিআইএম-এর জন্যই। ও বৈঠকে আসেনি, আমি বিষয়টি উত্থাপিত করেছি। আমাদের কাছে এটা সন্তান হারানোর মতো বেদনাদায়ক ঘটনা।”
সেলিম আরও অভিযোগ করেন, তৃণমূল নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে এখন বামেদের তৈরি করা লড়াকু তরুণ নেতাদের টার্গেট করছে। তাঁর দাবি, “মিলিয়ন ডলার খরচ করে বামপন্থীদের নিকেশ করার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু শুভেন্দু-মমতার মাওবাদী যোগসাজশেও যদি সিপিআইএম শেষ না হয়ে থাকে, তবে কোনো পেশাদার সংস্থার স্ক্রিপ্টে এই দলের যৌবন শেষ হবে না।”
কলার খোসা বিতর্ক ও সেলিমের আত্মপক্ষ সমর্থন
সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়ে সাংবাদিকদের ‘কলার খোসা’ দেখানোর অভিযোগে বিদ্ধ হয়েছিলেন সেলিম। সেই ট্রোলিং ও সমালোচনা নিয়ে এদিন মুখ খোলেন তিনি। সাফাই দিয়ে সেলিম জানান, তিনি কোনো অভদ্রতা করতে চাননি। তাঁর কথায়, “আমি কলার খোসা দেখাইনি। গাড়ির কাচ নামিয়ে বলেছিলাম বুম সরাও, খোসাটা ফেলতে হবে।” যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীকের দলবদলের চাপে মেজাজ হারিয়েই এমন কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন বর্ষীয়ান এই নেতা।
কেন প্রতীক-উরকে নিয়ে এত টানাটানি
প্রতীক-উর রহমান কেবল একজন নেতাই নন, তিনি বামেদের তথাকথিত ‘শ্রেণি সংগ্রামের’ পোস্টার বয়। অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই নেতা দুইবার এসএফআই সভাপতির দায়িত্ব সামলেছেন। রাস্তায় নেমে লড়াই করা থেকে শুরু করে অভিষেকের খাসতালুকে বুক চিতিয়ে লড়াই—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। বামেদের আদর্শগত লড়াইয়ে তাঁর মতো একজন নেতার চলে যাওয়া মানে নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে ভুল বার্তা যাওয়া, যা বুঝতে পেরেই সেলিম কড়া ভাষায় তৃণমূলকে আক্রমণ শানিয়েছেন।
এখন দেখার, শনিবাসরীয় বিকেলে আমতলার মঞ্চে অভিষেকের হাত ধরে প্রতীক-উর নতুন কী বার্তা দেন এবং এর ফলে দক্ষিণ ২৪ পরগনা তথা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ কতটা বদলে যায়।