২০২৬ সালে কি সত্যিই বদলে যাবে নবান্নের দখল? বঙ্গ-বিজেপির নয়া ‘গোয়েবলস থিওরি’ ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতে এখনও কিছুটা দেরি থাকলেও, বাংলার রাজনৈতিক আঙিনায় এখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। আর এই লড়াইয়ে বঙ্গ-বিজেপির তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে বিশ্ববিখ্যাত ‘গোয়েবলস থিওরি’। রাজনৈতিক মহলের গুঞ্জন, পরাজয়ের আশঙ্কা থাকলেও ‘মিথ্যেকে বারবার বলে সত্যে পরিণত করার’ এই পুরোনো কৌশলকেই এবার হাতিয়ার করছে গেরুয়া শিবির। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে সুকান্ত মজুমদার থেকে শুভেন্দু অধিকারী— সকলের মুখেই এখন এক রা: ‘এবার বাংলায় ক্ষমতায় আসছে বিজেপি’।
দিল্লির নয়া প্রেসক্রিপশন: হার নিশ্চিত জেনেও জয়ের হুঙ্কার!
সূত্রের খবর, বঙ্গ-বিজেপির অন্দরে সংগঠন নিয়ে যখন ক্ষোভ বাড়ছে, ঠিক তখনই দিল্লি থেকে এসেছে এক বিশেষ টোটকা। বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটারদের মনে প্রভাব ফেলতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সুচারু এক পরিকল্পনা সাজিয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে একে বলা হয় ‘গোয়েবলস থিওরি’। নাৎসি প্রচারক জোসেফ গোয়েবলসের সেই বিখ্যাত দর্শন অনুযায়ী, কোনো একটি তথ্য (তা মিথ্যা হলেও) যদি বারবার আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রচার করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের অবচেতনে তা সত্য বলে গেঁথে যায়।
বিজেপির অন্দরের খবর, নীতিন নবীনের মতো কেন্দ্রীয় নেতারা বঙ্গ-বিজেপির বর্তমান মুখদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, সংগঠন দুর্বল থাকলেও জনসমক্ষে সবসময় ‘জয়ের গ্যারান্টি’ দিতে হবে। প্রতিটি সভা, প্রতিটি প্রেস মিট এমনকি চায়ের দোকানের আড্ডাতেও বিজেপি নেতাদের একটাই কথা বলতে হবে— ‘২০২৬ সালে বাংলায় বিজেপিই সরকার গড়ছে’। লক্ষ্য একটাই, ভোটারদের একাংশের মনে এই ধারণা তৈরি করা যে এবার সত্যিই পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় ধাক্কা ও বিচারবিভাগীয় নজরদারি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই মরিয়া কৌশলের নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক আইনি ধাক্কা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামলার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার কাজ এবার থেকে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা তদারকি করবেন। এর ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো গোপন কারসাজি বা ছলচাতুরির সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও ‘পারসেপশন ব্যাটল’ বা ধারণার লড়াইকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে গেরুয়া শিবির।
শমীক-শুভেন্দুদের গলায় আত্মবিশ্বাসের সুর না কি ‘কাল্পনিক বিলাস’?
বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য সম্প্রতি এক বিস্ফোরক দাবিতে জানিয়েছেন, “কেন্দ্রীয় বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হোক, ইডি-সিবিআই অফিসে তালা ঝোলানো হোক, এমনকি রাজ্য পুলিশ দিয়ে ভোট করালেও এবার বিজেপিই ক্ষমতায় আসবে।” সুকান্ত মজুমদার ও শুভেন্দু অধিকারীর গলাতেও এখন একই সুর।
তবে দলের এই নয়া কৌশলে সবাই যে খুব একটা আশাবাদী, তা নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেপির এক আদি নেতা কটাক্ষ করে বলেন, “এই পথে হেঁটে অনেকেই এখন কল্পনার বিলাসে ভাসছেন। কিন্তু বুথ স্তরে সংগঠনের যা হাল, তাতে শুধু গোয়েবলস থিওরি দিয়ে কতটা নির্বাচনী ফসল ঘরে তোলা যাবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।”
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলার সচেতন ভোটাররা কি এই প্রচারের ফাঁদে পা দেবেন, নাকি গোয়েবলসের এই থিওরি বুমেরাং হয়ে ফিরবে বিজেপির দিকেই? ২০২৬-এর আগে এই ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বাংলার রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।