স্কুলের রাস্তায় বাঁশের বেড়া দিয়ে চাষবাস, পঠনপাঠন চলছে গোয়ালঘরে

মানিকচক– গত ২৪ দিন ধরে তালাবন্ধ স্কুলের গেট। ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ড আর বেঞ্চের বদলে ছাত্রছাত্রীদের ঠিকানা এখন পাশের একটি নোংরা গরুর খামার। মালদা জেলার মানিকচক ব্লকের বাঁকিপুর জুনিয়র হাইস্কুলের এই নজিরবিহীন ছবি দেখে হতবাক এলাকাবাসী। স্কুলের যাওয়ার মূল রাস্তাটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে সেখানে ফসল বুনেছেন জমির মালিকরা। ফলে গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে স্কুলের ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় নেই শিক্ষক বা পড়ুয়াদের। নিরুপায় হয়ে স্কুলব্যাগের বোঝা কাঁধে নিয়ে গোয়ালঘরের দুর্গন্ধের মধ্যেই প্রতিদিন হাজিরা দিচ্ছে কচিকাঁচারা।
১৫ বছরের বঞ্চনা ও বর্তমান সংকট
২০১১ সালে মানিকচকের বাঁকিপুর শ্যামসুন্দরী গ্রামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী এবং চারজন কর্মী রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও স্কুলটিতে আজও বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছায়নি। স্কুলের নিজস্ব ৬৪ শতক জায়গা থাকলেও সেখানে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সরকারি রাস্তা নেই। জন্মলগ্ন থেকেই অন্যের ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে হতো সকলকে। সম্প্রতি সেই জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণের দাবিতে বেঁকে বসায় তৈরি হয়েছে এই অচলাবস্থা।
গোয়ালঘরেই কাটছে স্কুলের সময়
বুধবার সকালে স্কুল চত্বরে গিয়ে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা স্মিতা দত্ত থেকে শুরু করে অন্যান্য অশিক্ষক কর্মীরা রাস্তার ধারের একটি গোয়ালঘরে বসে আছেন। পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে একদল পড়ুয়া। স্কুলের পঠনপাঠন শিকেয় উঠেছে। শিক্ষিকা স্মিতা দত্ত আক্ষেপের সুরে জানান, “আমরা স্কুলেই ঢুকতে পারছি না। লিখিতভাবে বিডিও এবং এসআই-কে সব জানানো হয়েছে। সামনেই প্রথম সেমেস্টার পরীক্ষা, অথচ সিলেবাস শেষ করা তো দূরের কথা, পরীক্ষা নেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।”
জমি মালিকের পাল্টা দাবি
কেন বন্ধ করা হলো যাতায়াতের পথ? এই প্রশ্নে জমির মালিক সমীর মণ্ডল সাফ জানিয়েছেন, “আমার বাবা-জ্যাঠাদের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জমি দখল করে স্কুল করা হয়েছিল। আজও আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। আমাদের পৈতৃক সম্পত্তির ওপর দিয়ে আর কাউকে যেতে দেব না। প্রশাসন যদি জমি কিনে রাস্তা তৈরি করে, তবেই যাতায়াত সম্ভব হবে।”
প্রশাসনের ভূমিকা
দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা জিইয়ে থাকলেও কেন সমাধান হয়নি, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। তবে মানিকচকের বিডিও অনুপ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই বিএলআরও এবং ডিএলআরও-র সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে খুব দ্রুত জমি সংক্রান্ত আইনি জটিলতা কাটিয়ে স্কুলের রাস্তা খুলে দেওয়া হবে। এখন দেখার, কত দ্রুত প্রশাসনের এই আশ্বাস বাস্তবে রূপ পায় এবং গোয়ালঘর থেকে মুক্তি পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা আবার নিজেদের ক্লাসরুমে ফিরতে পারে।