একটাই ট্যাবলেট বদলে দেবে এইচআইভি চিকিৎসার ভবিষ্যৎ

একটাই ট্যাবলেট বদলে দেবে এইচআইভি চিকিৎসার ভবিষ্যৎ

এইচআইভি বা এইডস চিকিৎসায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক এক গবেষণা। এতদিন পর্যন্ত এইচআইভি আক্রান্তদের সুস্থ থাকতে প্রতিদিন একাধিক ওষুধের এক জটিল মিশ্রণ বা ‘মাল্টি-পিল’ সেবন করতে হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র বলছে, এখন থেকে একাধিক ওষুধের বদলে দিনে মাত্র একটি ট্যাবলেটেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে এই মারণ ব্যাধিকে।

গবেষণার নেপথ্যে যা জানা যাচ্ছে

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার ডেনভার শহরে আয়োজিত ‘কনফারেন্স অন রেট্রোভাইরাস অ্যান্ড অপরচুনিস্টিক ইনফেকশনস ২০২৬’ (CROI 2026)-এ এই গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। ‘আর্টিস্ট্রি-১’ (ARTISTRY-1) নামক এই ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি পরিচালনা করেছেন কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের অধ্যাপক ক্লো অর্কিন। বিশ্বের ১৫টি দেশের প্রায় ৫৫০ জনেরও বেশি এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি এই সুদীর্ঘ ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন।

নতুন ওষুধের বিশেষত্ব

নতুন এই দৈনিক ওরাল ট্যাবলেটে মূলত বর্তমানে ব্যবহৃত দুটি শক্তিশালী এইচআইভি প্রতিরোধী ওষুধ— ‘বিকটেগ্র্যাভির’ (Bictegravir) এবং ‘লেনাক্যাপাভির’ (Lenacapavir)-এর সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে BIC/LEN কম্বিনেশন। গবেষকদের দাবি, এই সংমিশ্রণ ভবিষ্যতে এইচআইভি চিকিৎসার প্রচলিত ও জটিল পদ্ধতির একটি অত্যন্ত কার্যকর এবং সহজ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের প্রেক্ষাপট ও বিশেষজ্ঞ মত

এই নতুন উদ্ভাবন নিয়ে আশাবাদী হলেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন এইডস সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট-এমেরিটাস ডা. আই এস গিলাডা। তিনি জানান, বিকটেগ্র্যাভির এবং লেনাক্যাপাভির— এই দুটি ওষুধই আলাদাভাবে নিরাপদ বলে ইতিপূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে। তবে ভারতে এই নতুন সংমিশ্রণটি চালু করার আগে দেশীয় আবহে এর ফেজ-৩ ট্রায়াল সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। ডা. গিলাডার মতে, ভারতে বর্তমানে ২৬ লক্ষ মানুষ এইচআইভি নিয়ে জীবনযাপন করছেন, যার মধ্যে প্রায় ১৮ লক্ষ মানুষ নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় রয়েছেন। ভারতে বর্তমানে ‘টেনোফোভির’, ‘ল্যামিভুডাইন’ এবং ‘ডলুটেগ্র্যাভির’ (TLD)-এর সংমিশ্রণ ব্যবহৃত হয়। নতুন এই ‘এক ট্যাবলেট’ পদ্ধতি অনুমোদন পেলে তা চিকিৎসার তালিকায় চতুর্থ বিকল্প হিসেবে যুক্ত হবে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সরলীকরণ। কার্যকারিতার দিক থেকে এটি বর্তমান চিকিৎসার সমান হলেও, রোগীদের জন্য প্রতিদিন একাধিক ওষুধের বোঝা কমিয়ে মাত্র একটি ট্যাবলেটে নিয়ে আসাটা হবে এক বিশাল স্বস্তি। যদি ভারতীয় জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো এই ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি পায়, তবে ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে এই আধুনিক চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। আপাতত বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকমহল ল্যানসেটের এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন আশার আলো দেখছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *