বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের ওপর চরম নির্যাতনকে হাতিয়ার করে যুদ্ধের ময়দানে তৃণমূল

নিজস্ব সংবাদদাতা, চাঁচল: বাংলার রাজনীতিতে এবার এক নতুন রণকৌশল নিয়ে অবতীর্ণ হচ্ছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। উত্তর মালদহের চাঁচল মহকুমার চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর চলা অকথ্য অত্যাচারের স্মৃতিকে হাতিয়ার করেই নির্বাচনী ময়দান কাঁপানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ঘাসফুল শিবির। বিশেষত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি শ্রমিকদের ওপর যেভাবে ‘বাংলাদেশি’ তকমা সেঁটে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, সেই জ্বলন্ত ইস্যুকেই এবার প্রচারের মূল স্তম্ভ করতে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। তৃণমূল সূত্রের খবর, এবার আর শুধু নেতা-নেত্রীদের ভাষণ নয়, বরং গুজরাত, দিল্লি কিংবা হরিয়ানায় লাঞ্ছিত হওয়া সেইসব শ্রমিকদেরই সরাসরি মানুষের সামনে এনে দাঁড় করানো হবে। তাদের মুখ থেকেই জনতা শুনবে পরবাসে বাঙালি হওয়ার অপরাধে সওয়া যন্ত্রণার হাড়হিম করা কাহিনী।
পরবাসে বাঙালি নিগ্রহ বনাম রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াই
চাঁচল, হরিশ্চন্দ্রপুর, রতুয়া ও মালতীপুর— মূলত কৃষিনির্ভর এই চার বিধানসভা এলাকার হাজার হাজার মানুষ পেটের টানে প্রতি বছর পাড়ি দেন ভিনরাজ্যে। কিন্তু অভিযোগ, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে গিয়ে তারা বারবার চরম হেনস্তার শিকার হন। বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও কখনও তাদের থানায় আটকে রাখা হয়েছে, আবার কখনও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে চালানো হয়েছে অমানবিক তল্লাশি। কয়েক মাস আগে ঘটা এই বিভীষিকাময় ঘটনাগুলো আজও মালদহের গ্রামগঞ্জের মানুষের মনে টাটকা। তৃণমূল নেতৃত্ব চাইছে সেই স্মৃতিকেই আরও একবার উস্কে দিতে, যাতে পদ্ম শিবিরের প্রতি জনমানসে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
তৃণমূলের মরণকামড় ও একশো দিনের কাজের বঞ্চনা
মালদহ জেলা তৃণমূল সভাপতি আব্দুর রহিম বক্সি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এই পরিস্থিতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, বিজেপি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বাংলায় একশো দিনের কাজের টাকা আটকে রেখেছে, যার ফলে গ্রামের গরিব মানুষ বাধ্য হয়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের রাজ্যের শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে গিয়ে অপমানিত হতে হচ্ছে। বাঙালি শ্রমিকদের বাংলাদেশি তকমা দেওয়া চরম লজ্জার। কয়েকশো শ্রমিক যারা বিজেপি শাসিত রাজ্যে মার খেয়েছেন বা লাঞ্ছিত হয়েছেন, তাদেরই আমরা প্রচারের সামনের সারিতে রাখব। মানুষ ভোটের বাক্সে এই অপমানের যোগ্য জবাব দেবে।”
পাল্টা আক্রমণে বিজেপি ও সরকারি পরিসংখ্যানের ছবি
তৃণমূলের এই মাস্টারস্ট্রোককে অবশ্য আমল দিতে নারাজ গেরুয়া শিবির। উত্তর মালদহ বিজেপির সাধারণ সম্পাদক অভিষেক সিঙ্ঘানিয়া পাল্টা তোপ দেগে জানিয়েছেন, রাজ্যে কোনো স্থায়ী শিল্প বা কর্মসংস্থান নেই বলেই মানুষ পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। ভোট আসতেই তৃণমূল মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা শুরু করেছে বলে তার অভিযোগ। তবে রাজনীতির এই চাপানউতোরের মাঝে সরকারি তথ্য কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। চাঁচল মহকুমা শ্রম দপ্তরের সহকারী কমিশনার নৌসাদ আলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র এই মহকুমাতেই পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ যোজনায় নথিভুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ১ লক্ষ ৩০ হাজার। এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের ভোট এবং তাদের পরিবারের আবেগ যে আসন্ন নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর সেই ‘অত্যাচারিত’ মুখগুলো যখন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলবে, তখন উত্তর মালদহের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার। শাসকদলের এই কৌশল কি বিরোধীদের জমি আলগা করতে সফল হবে? উত্তর দেবে সময়।