রাজ্যের স্কুলে আমূল বদল ঘটাতে ২৪০০ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের ঘোষণা করল নবান্ন

রাজ্যের স্কুলে আমূল বদল ঘটাতে ২৪০০ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের ঘোষণা করল নবান্ন

নিউজ ডেস্ক

বাংলার স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘মডেল স্কুল’ তৈরির এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হতে চলেছে। প্রায় ২,৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে চলা এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলার প্রান্তিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করাই মূল লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার নবান্নে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘স্কুলশিক্ষার সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের বিস্তারিত রূপরেখা পেশ করেন। তিনি জানান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক বা এডিবি-র আর্থিক সহায়তায় রাজ্যজুড়ে মোট ৪৩০টি মডেল স্কুল গড়ে তোলা হবে। এই প্রকল্পের মোট খরচের ৭০ শতাংশ বহন করবে এডিবি এবং বাকি ৩০ শতাংশ দেবে রাজ্য সরকার। বিশেষত রাজ্যের ৮৭টি অনগ্রসর ব্লকের প্রতিটিতে দুটি করে এবং বাকি প্রতিটি ব্লকে একটি করে বিদ্যমান স্কুলকে বেছে নিয়ে সেগুলিকে আধুনিক মডেল স্কুলে রূপান্তরিত করা হবে।

মডেল স্কুলে থাকছে যে সব অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা

এই ৪৩০টি মডেল স্কুল হবে আধুনিক শিক্ষার আঁতুড়ঘর। শিক্ষামন্ত্রী জানান, নতুন পরিকাঠামোয় থাকবে—

  • উন্নত স্মার্ট ক্লাসরুম এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি।
  • সম্পূর্ণ ডিজিটাল পরিকাঠামো ও হাই-টেক লাইব্রেরি।
  • ইকো-ফ্রেণ্ডলি বা পরিবেশবান্ধব ভবন ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
  • প্রতিবন্ধী পড়ুয়াদের জন্য বিশেষ পঠনপাঠন ও চলাচলের সুবিধা।
  • খেলাধুলার জন্য বিশেষ পরিকাঠামো এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা।

মন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেন যে, এই স্কুলগুলিতে বাংলা ও ইংরেজি— উভয় মাধ্যমেই পড়াশোনার সুযোগ থাকবে। লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম এবং ব্রিজ কোর্সের মাধ্যমে পড়ুয়াদের মেধার খামতি পূরণের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষকদের গুণগত মানোন্নয়নে চালু হবে ‘ব্লেন্ডেড টিচার প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট’ মডিউল।

অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রেও সংস্কারের জোয়ার

স্কুলশিক্ষার পাশাপাশি রাজ্যের শিশুশিক্ষা ও পুষ্টির বুনিয়াদ মজবুত করতে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির ভোলবদল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানান, প্রায় ২,১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজ্যের ৫০,০০০ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের আধুনিকীকরণ করা হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই কাজ সম্পন্ন হবে যেখানে শিশুদের উন্নত মানের শিক্ষাসামগ্রী, পুষ্টি এবং কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হবে। উল্লেখ্য, এই কর্মীদের সাম্মানিকও ইতিমধ্যেই ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করেছে রাজ্য।

নির্বাচন ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে মন্ত্রীর ক্ষোভ

এদিন আলোচনার মাঝেই স্কুলগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়ে কেন্দ্রের কড়া সমালোচনা করেন ব্রাত্য বসু। এপ্রিল মাসে স্কুল স্তরে পরীক্ষা চলার সময় পঠনপাঠন বন্ধ রেখে দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে স্কুলে রাখা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি ক্ষোভের সুরে বলেন, কেন্দ্র যদি স্কুলগুলিকে কেবল ‘ধর্মশালা’ হিসেবে মনে করে, তবে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সব মিলিয়ে, নবান্নের এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে বাংলার গ্রামগঞ্জেও শহরের নামী বেসরকারি স্কুলের মতো সুযোগ-সুবিধা সাধারণ ঘরের পড়ুয়ারা পাবে বলে আশাবাদী ওয়াকিবহাল মহল। মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত মেলার ৩০ দিনের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু হতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *