৮ বছরের ইএমআই আর ৩ মাসের খেলাপি এক নিমেষে শেষ কোটি টাকার স্বপ্ন

নিজের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই বা স্বপ্নের ফ্ল্যাট কেনা প্রত্যেক ভারতীয়র কাছে কেবল একটি বিনিয়োগ নয়, বরং এক বিশাল আবেগ। কিন্তু এই আবেগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঠোর আর্থিক বাস্তবতাকে আমরা অনেক সময় উপেক্ষা করি। সম্প্রতি বেঙ্গালুরুর এক ব্যবসায়ীর জীবনের করুণ কাহিনী সেই রূঢ় বাস্তবকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। টানা আট বছর নিয়ম মেনে ঋণের কিস্তি (EMI) মেটানোর পর মাত্র তিন মাসের বকেয়া কীভাবে তাঁর ১.২ কোটি টাকার সাজানো সংসার তছনছ করে দিল, তা জানলে যেকোনো গৃহঋণ গ্রহীতা শিউরে উঠবেন।
স্বপ্নের অপমৃত্যু যেভাবে শুরু হলো
বেঙ্গালুরুর ওই ব্যবসায়ী গত আট বছর ধরে অত্যন্ত শৃঙ্খলার সাথে তাঁর ১.২ কোটি টাকার ফ্ল্যাটের হোম লোন পরিশোধ করছিলেন। কর্মক্ষেত্রের চাপ আর ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মাঝেও একটি কিস্তিও কখনও মিস করেননি তিনি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে গত অক্টোবর মাসে তিনি আকস্মিক চাকরি হারান। টানা তিন মাস কিস্তি জমা দিতে না পারায় জানুয়ারি মাসের মধ্যেই ব্যাংক কঠোর আইনি পথে হাঁটে।
‘সারফেসি’ (SARFAESI) আইনের অধীনে ব্যাংক তাঁকে নোটিশ পাঠায় এবং মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে তাঁর প্রিয় ফ্ল্যাটটি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এরপর বাজারদরের তোয়াক্কা না করে ব্যাংক দ্রুত সেটি মাত্র ৯৫ লক্ষ টাকায় নিলাম করে দেয়। ঋণের বকেয়া ৮০ লক্ষ টাকা ও অন্যান্য খরচ কেটে নেওয়ার পর ওই ব্যক্তির হাতে পড়ে রইল মাত্র ১৫ লক্ষ টাকা। আট বছরের হাড়ভাঙা খাটুনি আর তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় মাত্র দুমাসের ব্যবধানে কার্যত ছাই হয়ে গেল।
মালিকানার মায়া নাকি একটি বিপজ্জনক আর্থিক ধারণা
ভারতীয় সমাজে ভাড়া বাড়িতে থাকাকে অনেকেই “টাকা নষ্ট” বলে মনে করেন। নিজের বাড়ি থাকাকে আভিজাত্য ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু পেশাদার আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি সাময়িক দৃষ্টিভঙ্গি। বাস্তব হলো, ঋণের শেষ কিস্তিটি পরিশোধ না করা পর্যন্ত সেই বাড়ির আইনত মালিক আপনি নন। আপনার কাছে যা এক টুকরো আবেগ, ব্যাংকের কাছে তা স্রেফ একটি ‘বন্ধক’ বা গ্যারান্টি। যখনই আয়ের উৎস বন্ধ হয়, সেই নিরাপত্তার ঠুনকো দেয়াল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
তিন মাসের বকেয়া ও ব্যাংকের কঠোর অবস্থান
অনেকেই মনে করেন চাকরি গেলে বা অসুস্থ হলে ব্যাংক হয়তো মানবিক দিক বিবেচনা করবে। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সহানুভূতির জায়গা খুব কম। ‘সারফেসি’ আইনের অধীনে ব্যাংকগুলির নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা রয়েছে যা গ্রাহকের প্রতিকূলে কাজ করে:
- টানা ৯০ দিন কিস্তি না দিলে অ্যাকাউন্টকে এনপিএ (NPA) বা অনাদায়ী সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা।
- মালিকানা দখলের জন্য মাত্র ৬০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া।
- আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা এড়িয়ে সরাসরি সম্পত্তি নিলাম করার ক্ষমতা।
ব্যাংক মূলত আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় দায়বদ্ধ, তাই আপনার আট বছরের সুশৃঙ্খল ট্র্যাক রেকর্ড সেখানে খুব একটা গুরুত্ব পায় না।
এই বিপর্যয় এড়ানোর উপায় কী
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মীনাল গোয়েল এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন:
১. ব্যাংকের সাথে আগাম যোগাযোগ: কিস্তি খেলাপি হওয়ার আগেই যদি ব্যাংককে আপনার আর্থিক সংকটের কথা জানানো হয়, তবে অনেক সময় তারা বিকল্প পথ বাতলে দেয়। যেমন— লোনের মেয়াদ বাড়িয়ে কিস্তির পরিমাণ কমানো অথবা কিছু সময়ের জন্য ‘মোরাটোরিয়াম’ বা কিস্তি স্থগিত রাখা।
২. নিজ উদ্যোগে সম্পত্তি বিক্রয়: যদি পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়, তবে ব্যাংক নিলাম করার আগেই নিজে ক্রেতা খুঁজে বাড়ি বিক্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ। ব্যাংক নিলামে বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দাম পাওয়া যায়। বেঙ্গালুরুর ওই ব্যক্তি যদি নিজে বাড়িটি ১.১ বা ১.২ কোটিতে বিক্রি করতেন, তবে সব দেনা মিটিয়েও তাঁর হাতে অন্তত ৩০-৪০ লক্ষ টাকা থাকত এবং তাঁর ক্রেডিট স্কোরও নষ্ট হতো না।
লোন নেওয়ার সময় গ্ল্যামারাস বিজ্ঞাপনে মুগ্ধ না হয়ে বরং সংকটের মুহূর্তের জন্য তৈরি থাকাটাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। মনে রাখবেন, কিস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়া মানে কেবল একটি বাড়ি হারানো নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে করা আপনার কঠোর পরিশ্রমের বিসর্জন।