ফালাকাটার বংশীধরপুর কি আজও সেই মায়াবী রাখালের বাঁশির সুরে জাগে

ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা নথিপত্র নয়, উত্তরবঙ্গের ফালাকাটা ব্লকের বংশীধরপুর গ্রামটি নিজেই যেন এক জীবন্ত রূপকথা। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন এই জনপদের আনাচে-কানাচে আজও মিশে আছে দুশো বছরের পুরনো লোকগাথা আর এক অমোঘ সুরের প্রতিধ্বনি। ফালাকাটা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের এই নিঝুম গ্রামটি বর্তমানে রাজবংশী, নেপালি, আদিবাসী এবং দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে আসা মানুষের এক মেলবন্ধনের চারণভূমি।
বংশীধরপুর নামের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে দুটি চমৎকার জনশ্রুতি। আজ থেকে প্রায় দুই শতাব্দী আগে চরতোর্ষা ও বুড়িতোর্ষা নদীর অববাহিকায় এই বিস্তীর্ণ প্রান্তর ছিল গবাদি পশুর স্বর্গরাজ্য। কথিত আছে, সেই সময় রাখালরা নদীর চরে গরু চরাতেন এবং শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত হিসেবে নিজেদের হাতে তৈরি বাঁশিতে তুলতেন মায়াবী সুর। সেই ‘বংশীধর’ বা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি আর রাখালদের বাঁশির মূর্ছনা থেকেই এই জনপদের নাম হয় বংশীধরপুর। আজও পড়ন্ত বিকেলে বুড়িতোর্ষার তীরে দাঁড়ালে প্রবীণরা সেই হারানো সুরের আবেশ খুঁজে পান।
নামকরণের আরেকটি প্রচলিত ইতিহাস জড়িয়ে আছে বংশীধর দুবে নামে এক সাবেক বাসিন্দার সঙ্গে। স্থানীয়দের মতে, প্রায় দেড়শো বিঘা জমির মালিক এই ব্যক্তির মাটির প্রতি টান এবং তাঁর বিশাল প্রতিপত্তি থেকেই কালক্রমে এই মৌজাটি ‘বংশীধরপুর’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রকৃতি আর মানুষের মিতালিতে গড়া এই গ্রামটি আজও তার আদিম সতেজতা ধরে রেখেছে। নেপালিপাড়ার অলিগলি থেকে শুরু করে বনের কোল ঘেঁষে থাকা বসতিগুলোতে আজও ইতিহাসের সেই মায়াবী আবেশ অমলিন। আধুনিকতার ভিড়েও বংশীধরপুর তার শিকড় ভোলেনি, বরং বুড়িতোর্ষার বয়ে চলা জলের শব্দে আজও যেন সেই প্রাচীন রাখালি সুরের প্রতিধ্বনি খুঁজে ফেরেন গ্রামবাসী।