সোনার বাজারে উলটপুরাণ! যুদ্ধের মাঝেও কেন সস্তা হচ্ছে গয়না এবং বিনিয়োগের এই সম্পদ

১. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না কি নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ? গত ৪৩ বছরের রেকর্ড ভেঙে গত এক সপ্তাহে সোনার দাম প্রায় ১১ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৮৩ সালের পর এক সপ্তাহে এত বড় পতন আর কখনও দেখা যায়নি। অথচ ইতিহাস বলে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন বা ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সোনার দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। এবার ইরান সংঘাতের ২৫ দিনের মাথায় ২৪ ক্যারেট সোনার দাম গ্রাম প্রতি প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
২. ডলারের আধিপত্য ও ‘সেফ হেভেন’ বদল বর্তমানে সোনার দাম কমার প্রধান কারণ হলো মার্কিন ডলারের অভাবনীয় শক্তিশালী অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে লগ্নিকারীরা এবার সোনার চেয়ে ডলারের ওপর বেশি ভরসা রাখছেন। যখন ডলার সূচক (Dollar Index) ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা কমে যায়। বড় বড় বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলো এখন সোনা বিক্রি করে সেই অর্থ ডলারে গচ্ছিত রাখছে, যা সোনার বাজারে বড়সড় ধস নামিয়েছে।
৩. আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ও বন্ড মার্কেটের প্রভাব আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ফেডারেল রিজার্ভ বর্তমানে সুদের হার কমানোর কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। উল্টে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কড়া অবস্থান নিয়েছে তারা। এর ফলে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করলে নিশ্চিত ও উচ্চ হারে সুদ পাওয়া যাচ্ছে। যেহেতু সোনা সরাসরি কোনো সুদ প্রদান করে না, তাই চতুর বিনিয়োগকারীরা সোনা ছেড়ে মার্কিন সরকারি বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন। জিরো পার্সেন্ট রিটার্নের সোনার চেয়ে সুদমুক্ত বন্ড এখন অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
৪. বড় অংকের প্রফিট বুকিং ২০২৫ সালের শুরু থেকেই সোনার দাম আকাশছোঁয়া ছিল। এক সময় যা গ্রাম প্রতি ৭,৮০০ টাকা ছিল, তা এক লাফে ১৩,০০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর যখনই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, বড় বিনিয়োগকারীরা নিজেদের মুনাফা নিশ্চিত করতে (Profit Booking) বিপুল পরিমাণ সোনা বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। জোগান বেড়ে যাওয়ায় এবং ক্রেতা কমে আসায় দাম স্বাভাবিকভাবেই নিম্নমুখী হয়েছে।
৫. রুপোর বাজারেও বড় পতন শুধু সোনা নয়, শিল্পক্ষেত্রে অপরিহার্য ধাতু রুপোর দামেও ধস নেমেছে। যুদ্ধের শুরুতে যে রুপোর দাম কেজি প্রতি ২.৯৫ লক্ষ টাকা ছিল, তা এখন প্রায় ৬০ হাজার টাকা কমে ২.৩৫ লক্ষ টাকায় নেমে এসেছে। বিশ্বজুড়ে শিল্পোৎপাদনে মন্দার আশঙ্কা এবং বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহই এই পতনের মূল কারণ।
ভবিষ্যৎ কী বলছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনার এই দরপতন সাময়িক। বাজার যখন খুব বেশি তেজি হয়ে যায়, তখন স্থিতিশীলতা ফেরাতে এমন সংশোধন বা ‘কারেকশন’ প্রয়োজন হয়। তবে যুদ্ধের তীব্রতা যদি আরও বৃদ্ধি পায় এবং তেলের বাজারে সংকট তৈরি হয়, তবে দাম আবারও বাড়তে পারে। আপাতত পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে যে, ২৪ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ১ লক্ষ টাকার নিচে নামার সম্ভাবনা প্রবল। তাই যারা গয়না কেনা বা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের কথা ভাবছেন, তাঁদের জন্য এই সময়টি একটি সুবর্ণ সুযোগ হতে পারে।