ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ থামাতে চীনের পঞ্চমুখী শান্তি পরিকল্পনা, বেইজিং-ইসলামাবাদ জোট

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। তেলের আকাশছোঁয়া দাম বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তোলায় এবার শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নিতে চাইছে চীন। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানে সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ঠিক তখনই চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে একটি ‘পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা’ পেশ করেছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করা।
দীর্ঘদিন আমেরিকার মিত্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান এই সংকটে এক অপ্রত্যাশিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বেইজিংয়ে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের পর চীন এই শান্তি প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। লানঝৌ ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের এই নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পাকিস্তানকে মধ্যস্থতায় আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালনে সহায়তা করবে। আগামী মাসে শি জিনপিং ও ট্রাম্পের মধ্যে নির্ধারিত বাণিজ্য বৈঠকের আগে চীনের এই সক্রিয়তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
চীনের এই আকস্মিক হস্তক্ষেপের পেছনে প্রধানত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার তাগিদ কাজ করছে। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। লোহিত সাগর বা পারস্য উপসাগরের জলপথ বন্ধ থাকলে চীনের রপ্তানি বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে। খেলনা থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ সচল রাখতে বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি চায়। এছাড়া এই অঞ্চলে চীনের বিশাল বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে।
কূটনৈতিক দিক থেকে চীন নিজেকে একটি নিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। এর আগে ২০২৩ সালে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতাতেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্স্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যেও ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছে চীন। আমেরিকার মতো মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কোনো বড় সামরিক ঘাঁটি না থাকলেও, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাকে পুঁজি করেই বেইজিং দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।
তবে এই শান্তি পরিকল্পনার সাফল্য নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে, কারণ ইরান বা আমেরিকা কেউই এখন পর্যন্ত এর ওপর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। চীনের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠতা অনেক ক্ষেত্রে তার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের আগ্রাসী মেজাজের বিপরীতে শি জিনপিং নিজেকে একজন ‘শান্তি দূত’ হিসেবে তুলে ধরে বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার সমান্তরাল এক নতুন মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত চীনের এই কূটনীতি তেলের বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিকে কতটা স্বস্তি দিতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।