৫৪ বছর পর ফের চাঁদে মানুষ
প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে চন্দ্রাভিযানের এক নতুন মহাকাব্য লিখতে শুরু করেছে নাসা। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে চার নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের উদ্দেশে সফলভাবে পাড়ি জমিয়েছে আর্টেমিস-২ মিশনের মহাকাশযান ‘ওরিয়ন’। ১০ দিনের এই ঐতিহাসিক যাত্রায় অংশ নিয়েছেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কচ ও জেরেমি হ্যানসেন। এই মিশনেই প্রথম কোনো নারী, কৃষ্ণাঙ্গ এবং কানাডীয় নভোচারী গভীর মহাকাশে ভ্রমণের নজির গড়ছেন।
ওরিয়ন মহাকাশযানটি আকারে একটি ছোট ভ্যানের সমান, যার অভ্যন্তরীণ আয়তন মাত্র ৩৩০ বর্গফুট। এই সংকীর্ণ পরিসরেই চার নভোচারীকে টানা ১০ দিন কাটাতে হবে। সেখানে নেই কোনো আলাদা ঘর বা শয্যা; দেয়ালে লাগানো স্লিপিং ব্যাগেই সারতে হবে ঘুম। মহাকাশযানে নেই কোনো তাজা খাবার বা রান্নার ব্যবস্থা। ১৮৯ ধরনের শুকনো ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং প্যাকেটজাত পানীয়ই তাদের একমাত্র ভরসা। স্নান করার সুযোগ না থাকলেও তারা ব্যবহার করছেন বিশেষ বডি ওয়াইপ ও ড্রাই শ্যাম্পু।
অভিযানের পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিনে ওরিয়ন মহাকাশযানটি ইতিহাস গড়বে। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লক্ষ কিলোমিটার দূরে গিয়ে অ্যাপোলো-১৩-এর দীর্ঘতম পথ পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড ভাঙবে। এই পর্যায়ে নভোচারীরা চাঁদের সেই অন্ধকার দিকটি দেখার সুযোগ পাবেন, যা পৃথিবী থেকে কখনো দেখা যায় না। তবে এই মিশনটি চাঁদে অবতরণের জন্য নয়; বরং চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে একে প্রদক্ষিণ করে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসার একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ মহাকাশ যাত্রা।
মহাকাশ বিজ্ঞানের এই চরম পরীক্ষায় রয়েছে নানা ঝুঁকি। মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে বাঁচতে নভোচারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক ঢাল। এছাড়া ওরিয়ন যখন চাঁদের উল্টো পিঠে থাকবে, তখন প্রায় ৩০ থেকে ৫০ মিনিট পৃথিবীর সাথে সব ধরনের রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে। এই সময়টুকুতে সম্পূর্ণ নিজেদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে হবে ক্রু সদস্যদের। শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রতিদিন তাদের অন্তত ৩০ মিনিট বাধ্যতামূলক ব্যায়াম করতে হচ্ছে।
যাত্রার শেষ দিনে ওরিয়ন প্রতি সেকেন্ডে ১১ কিলোমিটার তীব্র গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। প্রচণ্ড তাপ ও বায়ুর চাপ কাটিয়ে প্যারাসুটের মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ার কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে যানটি। এই সফল প্রত্যাবর্তনই নিশ্চিত করবে যে মানুষ আবারো গভীর মহাকাশে দীর্ঘ সময়ের জন্য বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠেছে। আর্টেমিস-২ মূলত ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানের একটি প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।