ইরান ইসরায়েল সংঘাতের কোপ, কাশ্মীরের হস্তশিল্পে বিপাকে ৪ লাখ কারিগর ও বিপুল আর্থিক ক্ষতি

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তাপ এবার সরাসরি আছড়ে পড়ল কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প খাতে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার জেরে বিদেশের মাটিতে কাশ্মীরের হস্তশিল্প সংক্রান্ত তিনটি বড় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে ডেনমার্ক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং বেজিংয়ে কাশ্মীরি পণ্যের বাজার ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে রপ্তানিকারকদের। গত কয়েক মাসে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ব্যবসা মধ্যপ্রাচ্যে আটকে যাওয়ায় উপত্যকার অর্থনীতিতে চরম মন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির প্রভাব সবথেকে বেশি পড়েছে কাশ্মীরের প্রায় ৪.৫ লাখ কারিগর ও শিল্পীদের ওপর। পশমিনা শাল, গালিচা, পেপার-মেশে এবং আখরোট কাঠের কাজ করা পণ্যগুলি বর্তমানে গুদাম ও কারিগরদের ঘরে স্তূপাকার হয়ে পড়ে আছে। বিশ্ববাজার থেকে নতুন কোনো অর্ডার না আসায় দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা কয়েক লক্ষ শিল্পী কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। রপ্তানিকারকরা কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং কারিগরদের বকেয়া টাকা মেটাতে পারছেন না, কারণ বিদেশের বাজারে পাঠানো মালের পেমেন্ট আটকে রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর কাশ্মীরি গালিচা ও হস্তশিল্প রপ্তানি করে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা আয় হয়। চলতি বছর রমজান ও ইদ উপলক্ষে প্রায় ৪১০ কোটি টাকার ব্যবসা হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধের কারণে সেই অর্থ এখন বিশ বাঁও জলে। অন্তত ৬০০টি রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। বসন্তকাল সাধারণত কাশ্মীরি হস্তশিল্পের প্রধান মরসুম হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের শ্লথগতি ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
হস্তশিল্পের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় ২ লাখ কাশ্মীরি নাগরিকের জীবিকাও এখন সংকটের মুখে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব এবং কাতারের মতো দেশগুলিতে কর্মরত কাশ্মীরিদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে উপত্যকার কয়েক লক্ষ পরিবারের আয়ের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শোরুম ম্যানেজারদের দাবি, মার্চ এবং এপ্রিল মাস সবচেয়ে ব্যস্ত সময় হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে তাঁদের হাতে কোনো কাজ নেই।
এই গভীর সংকটের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন কাশ্মীরের ডিভিশনাল কমিশনার অংশুল গর্গ। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত অংশীদারদের সঙ্গে সরকার নিরন্তর আলোচনা চালাচ্ছে এবং উদ্ভূত সমস্যার কথা কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হয়েছে। বিদেশ মন্ত্রক এবং বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রক এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। উপত্যকার রপ্তানিকারকরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পশ্চিম এশিয়ার এই সামরিক সংঘাত বন্ধে মধ্যস্থতা করার আবেদন জানিয়েছেন যাতে ধ্বংসের হাত থেকে এই শতাব্দীপ্রাচীন শিল্পকে রক্ষা করা যায়।