পশ্চিমবঙ্গে বিচারকদের ওপর হামলা, মালদহে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

পশ্চিমবঙ্গে বিচারকদের ওপর হামলা, মালদহে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় এসআইআর (SIR) বা স্পেশাল ইন্সপেকশন রিপোর্টের কাজে নিযুক্ত বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নজিরবিহীন কড়া অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চালীর ডিভিশন বেঞ্চ এই ঘটনাকে বিচারব্যবস্থাকে ভয় দেখানোর এক ‘পরিকল্পিত চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছে। আদালত সাফ জানিয়েছে, এটি কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অবিলম্বে ওই এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত বুধবার বিকেলে মালদহের কালিয়াচক এলাকায়। সেখানে এসআইআর-এর কাজে ব্যস্ত তিন মহিলা বিচারকসহ সাতজন বিচার বিভাগীয় আধিকারিককে একদল দুষ্কৃতী দীর্ঘ সময় ঘেরাও করে রাখে। গভীর রাতে তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ফেরার পথে তাঁদের গাড়িতে পাথর ও লাঠি দিয়ে হামলা চালানো হয়। এমনকি ওই আধিকারিকদের দীর্ঘক্ষণ অভুক্ত অবস্থায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি আমলে নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, রাজ্যের প্রশাসনিক ও পুলিশি ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।

আদালত এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের মুখ্য সচিব ও পুলিশ মহানির্দেশককে (ডিজিপি) কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে। আগামী ৬ এপ্রিল তাঁদের অনলাইনে আদালতে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, মালদহের এই অপ্রীতিকর ঘটনার তদন্তভার সিবিআই (CBI) অথবা এনআইএ (NIA)-র হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। মামলার প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট আগামী ৬ এপ্রিলের মধ্যে সরাসরি আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন যে, রাজ্যের শীর্ষ আধিকারিকদের জানানো সত্ত্বেও তাঁরা কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

শুনানি চলাকালীন সুপ্রিম কোর্ট আরও কিছু কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আদালত জানিয়েছে, এসআইআর সংক্রান্ত শুনানির সময় দুই বা তিনজনের বেশি মানুষকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না এবং পাঁচজনের বেশি জমায়েত নিষিদ্ধ থাকবে। বিচারপতি সূর্যকান্ত মন্তব্য করেন যে, পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে চরমভাবে মেরুকরণ হওয়া একটি রাজ্য, যেখানে প্রশাসনিক আধিকারিকরাও রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলছেন। মাঝরাত পর্যন্ত এই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল ও প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মন্তব্য প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালে আদালত জানায়, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করেই এমন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এই আদেশের ফলে মালদহসহ স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। বিচারকদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। আধিকারিকদের গাফিলতির কারণে কেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা নিয়ে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় স্তরে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *