ভারত পাকিস্তান সম্পর্কের বরফ গলাতে সক্রিয় পর্দার ওপারের কূটনীতি কাতারে গোপন বৈঠক

ভারত পাকিস্তান সম্পর্কের বরফ গলাতে সক্রিয় পর্দার ওপারের কূটনীতি কাতারে গোপন বৈঠক

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে তলানিতে থাকলেও নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে অনানুষ্ঠানিক ‘ট্র্যাক-২’ চ্যানেল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারের দোহায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে পাকিস্তান সমর্থিত জঙ্গি হামলার পর দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে তিক্ততা চরম পর্যায়ে পৌঁছালেও, এই অনানুষ্ঠানিক আলোচনা জারি রাখার প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত পর্দার আড়ালে থেকে আলোচনার এই ধারা কয়েক দশক ধরে বজায় রয়েছে।

‘ট্র্যাক-২’ কূটনীতি হলো এমন একটি মাধ্যম যেখানে দুই দেশের প্রাক্তন আমলা, বর্ষীয়ান সাংবাদিক, ব্যবসায়ী নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। যখন সরকারি স্তরে আলোচনার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন এই ধরণের আলাপ-আলোচনা ভুল বোঝাবুঝি কমাতে এবং বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই আলোচনার বিষয়ে সাধারণত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা বিবৃতি জারি করা হয় না, যা একে রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমের লাইমলাইট থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।

বিশ্বজুড়ে যখনই দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তখন কূটনীতির এই কৌশলটি প্রয়োগ করা হয়। ইতিহাসে ‘নিমরাণা সংলাপ’ ভারত-পাক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাক-২ আলোচনা হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালে মার্কিন কূটনীতিক জোসেফ মন্টভিলে প্রথম এই ‘ট্র্যাক-২’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এটি ‘ট্র্যাক-১’ বা সরকারি স্তরের সংলাপের চেয়ে আলাদা, কারণ এখানে কোনো প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা থাকে না, ফলে নতুন ধারণার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সহজ হয়।

ভারত কেবল পাকিস্তানের সঙ্গেই নয়, চীন ও কানাডার মতো দেশের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপড়েন কাটাতে এই গোপন কূটনীতির সফল প্রয়োগ করেছে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারতের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ট্র্যাক-২ আলোচনার মাধ্যমেই যোগাযোগের পথ খোলা রাখা সম্ভব হয়। এর ফলস্বরূপ ২০২৫ সালে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের সাক্ষাৎ এবং পাঁচ বছর পর সরাসরি বিমান চলাচল ও সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। চলতি বছরে ব্রিকস সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরও সেই সফল কূটনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কানাডার সঙ্গে কূটনৈতিক সংঘাতের সময়েও ভারত এই পর্দার ওপারের কূটনীতিকে হাতিয়ার করেছে। হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক তলানিতে ঠেকলে ‘ট্র্যাক-১.৫’ কূটনীতি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। ২০২৬ সালের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনা সেই প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এবং কৌশলগত সুবিধা আদায়ে ভারত যেভাবে এই নেপথ্য কূটনীতি ব্যবহার করছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *