পিএফের ১২ শতাংশ সুদের সেই সোনালি দিন এখন অতীত কেন, কমছে রিটার্ন জানুন আসল কারণ

পিএফের ১২ শতাংশ সুদের সেই সোনালি দিন এখন অতীত কেন, কমছে রিটার্ন জানুন আসল কারণ

অবসর জীবনের জন্য সঞ্চয়ের সবথেকে নিরাপদ এবং জনপ্রিয় মাধ্যম হলো কর্মচারী ভবিষ্যৎ নিধি বা ইপিএফও (EPFO)। ভারতের কোটি কোটি চাকুরিজীবীর ভবিষ্যৎ এই তহবিলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক বছরে পিএফ-এর সুদের হার বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, যে সুদের হার একসময় ১২ শতাংশের আশেপাশে থাকত, তা এখন কেন এতটা কমে গেল? কেন এই পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে, তা নিয়ে বর্তমানে দেশজুড়ে চর্চা চলছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আশির দশকের শেষ এবং নব্বই দশকের শুরুর সময়টা ছিল পিএফ বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ‘সোনালি যুগ’। সেই সময় ইপিএফও তার সদস্যদের বার্ষিক ১১.৫ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ প্রদান করত। তৎকালীন মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিয়োগের অন্যান্য উৎসের তুলনায় এই রিটার্ন ছিল অভাবনীয়। নিরাপদ বিনিয়োগের সঙ্গে এত উচ্চ হারে সুদ মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ছিল আশীর্বাদের মতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।

পিএফ-এর সুদের হার সরাসরি সরকার ও ইপিএফও-র বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর নির্ভর করে। এই অর্থ সাধারণত সরকারি বন্ড, করপোরেট বন্ড এবং শেয়ার বাজারের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয়। গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে এই বিনিয়োগগুলো থেকে গড় আয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যখন সরকারি সিকিউরিটিজের রিটার্ন হ্রাস পায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পিএফ-এর সুদের হারেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

ইপিএফও-র কেন্দ্রীয় ট্রাস্টি বোর্ড (CBT) প্রতি বছর সুদের হারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। সুদের হার কমানো বা বাড়ানোর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘সারপ্লাস ফান্ড’ বা উদ্বৃত্ত তহবিলের সঠিক ব্যবস্থাপনা। সরকারের প্রধান লক্ষ্য থাকে সুদের হার এমন স্তরে রাখা যাতে তা মুদ্রাস্ফীতিকে মোকাবিলা করতে পারে। ২০২৬-২৭ সাল পর্যন্ত সুদের হার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হলেও ভবিষ্যতে এটি জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে।

সুদের হার ১২ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানের ৮.২৫ শতাংশের আশেপাশে নেমে আসায় বিনিয়োগকারীদের পকেটে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২-৩ শতাংশ সুদের পার্থক্যও ম্যাচিউরিটির সময় কয়েক লক্ষ টাকার ব্যবধান তৈরি করতে পারে। এই বিপুল আর্থিক ফারাকের কথা মাথায় রেখেই বিশেষজ্ঞরা এখন শুধুমাত্র পিএফ-এর ওপর নির্ভর না করে মিউচুয়াল ফান্ড বা এসআইপির (SIP) মতো বিকল্প ক্ষেত্রেও সামান্য অংশ বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে পিএফ-এর সুদের হার কমে যাওয়া নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশঙ্কা থাকলেও এটি এখনও ভারতের অন্যতম সুরক্ষিত বিনিয়োগ মাধ্যম। তবে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে নিজের সঞ্চয়কে সুরক্ষিত রাখতে এবং অবসরের পর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে বিনিয়োগকারীদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাজারের ওঠা-নামার ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনে এই সুদের গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হবে বলে মনে করছেন অর্থ বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *