দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের নয়া চাল, পাক আফগান দ্বন্দ্বে কি কোণঠাসা হবে ভারত

দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের ‘শান্তিদূত’ হিসেবে তুলে ধরতে আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে চিন। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমনে বেজিংয়ের সাম্প্রতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০২১ সালে তালিবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে সীমান্ত সংঘাত ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে যে বৈরিতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে চিন এখন ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পথ প্রশস্ত করছে।
চিনা বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং নিশ্চিত করেছেন যে, তিনটি দেশের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয় দেশই চিনের এই মধ্যস্থতা গ্রহণে সম্মত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এই উদ্যোগকে আঞ্চলিক শান্তির প্রয়াস মনে হলেও, এর গভীরে বেজিংয়ের নিজস্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
আফগানিস্তানে চিনের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ এবং খনি প্রকল্পে কাজ করা চিনা নাগরিকদের নিরাপত্তা এখন বেজিংয়ের প্রধান মাথাব্যথার কারণ। বিশেষ করে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াখান করিডোর দিয়ে যাতে শিনজিয়াং প্রদেশে অস্থিরতা না ছড়ায়, তা নিশ্চিত করতে চায় চিন। তাই নিজের স্বার্থেই আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের কাছে অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই মধ্যস্থতার নেপথ্যে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে রুখে দেওয়ার একটি বড় পরিকল্পনা রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাথে তালিবান সরকারের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা চিনকে যথেষ্ট চিন্তায় ফেলেছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে এই অঞ্চলে ভারতের ভূমিকাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে বেজিং।
চিনের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। মধ্যস্থতাকারী সেজে এই এলাকায় নিজের আধিপত্য কায়েম করার মাধ্যমে চিন নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ায় একক নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। এটি সফল হলে ভারতের কৌশলগত অবস্থানে বড়সড় চ্যালেঞ্জ আসতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, চিনের এই শান্তি উদ্যোগ আসলে একটি দ্বিধারী তলোয়ার। একদিকে যেমন এটি প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে পারে, তেমনই অন্যদিকে এর আড়ালে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে দেওয়ার সূক্ষ্ম কৌশল কাজ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই রাজনৈতিক দাবার চালে শেষ পর্যন্ত জয় কার হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।