ক্রুড অয়েলের সংকট সামলাতে সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ার আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে। অধিকাংশ মানুষ এই মূল্যবৃদ্ধিকে কেবল পেট্রোল ও ডিজেলের সাথে সম্পর্কিত মনে করলেও, বাস্তবে এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। অপরিশোধিত তেল আধুনিক বিশ্বের মেরুদণ্ড, যা জ্বালানি ছাড়াও অসংখ্য শিল্পে ‘কাঁচামাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই সংকটের ফলে ঘরবাড়ির রং থেকে শুরু করে জীবনদায়ী ওষুধ ও গাড়ির টায়ার—সবকিছুর দাম একলাফে অনেকটা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রথম বড় আঘাত পড়বে রং শিল্পে। ঘরোয়া বা শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত রঙের ৫০ শতাংশের বেশি কাঁচামাল আসলে পেট্রোলিয়াম ভিত্তিক। ফলে তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকেই বইতে হয়। একইভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার পথে টায়ার ও রবার শিল্প। টায়ার তৈরির প্রধান উপাদান ‘সিন্থেটিক রবার’ এবং ‘কার্বন ব্ল্যাক’ সম্পূর্ণভাবে পেট্রোলিয়াম পণ্য। ফলে এই শিল্পে অস্থিরতা দেখা দিলে অটোমোবাইল সেক্টরে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে বাধ্য।
প্যাকেজিং ও ই-কমার্স খাতের খরচও আকাশচুম্বী হওয়ার পথে। খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে অনলাইন শপিংয়ের পণ্য সরবরাহ—সবক্ষেত্রেই প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এই প্লাস্টিক ‘পেট্রোকেমিক্যাল’ থেকে তৈরি হয়। তেলের দাম বাড়লে প্লাস্টিক দানার দাম বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে সাবান, শ্যাম্পু ও বিস্কুটের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় এফএমসিজি (FMCG) পণ্যের ওপর। এর ফলে দৈনন্দিন কেনাকাটায় সাধারণ মানুষের খরচ অনেকটাই বেড়ে যাবে।
বিমান পরিষেবা ও স্বাস্থ্যখাতেও বড় সংকটের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিমানের জ্বালানি (ATF) অপরিশোধিত তেল থেকেই উৎপাদিত হয়, যা যেকোনো এয়ারলাইনের মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ। তেল মহার্ঘ হলে টিকিটের দাম বাড়া নিশ্চিত। অন্যদিকে, চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এর অদৃশ্য প্রভাব রয়েছে। অনেক ওষুধের ফর্মুলেশন এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে পেট্রোকেমিক্যাল ভিত্তিক প্লাস্টিক ও রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়, যা চিকিৎসা পরিষেবাকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।
দৈনন্দিন জীবনের এমন অনেক ক্ষেত্রেও অপরিশোধিত তেলের অবদান রয়েছে যা সাধারণের কল্পনার বাইরে। সিন্থেটিক পোশাকের তন্তু, চাষের কাজে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক—সবই পেট্রোলিয়াম ভিত্তিক রসায়নের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি প্রসাধনী সামগ্রী এবং কলকারখানার লুব্রিকেন্ট তৈরিতেও এর কোনো বিকল্প নেই। সহজ কথায়, সকালের ব্রাশ থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই এই জ্বালানি তেলের সংকট সাধারণ জীবনযাত্রাকে জটিল ও মহার্ঘ করে তোলার সংকেত দিচ্ছে।