স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৮০টি মামলা! ১০ বছরের ‘মহাভারত’ শেষে ৫ কোটির খোরপোশের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের
এক দশকের দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং দাম্পত্য কলহের এক নজিরবিহীন অধ্যায়ের অবসান ঘটাল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ২০১০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এক দম্পতি, যাদের বিবাদ আদালত পাড়ায় ‘বিবাহের মহাভারত’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল, অবশেষে তাদের বিবাহবিচ্ছেদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই নির্দেশ দিয়েছেন।
তিক্ত দাম্পত্য ও আইনি প্রতিহিংসা
২০১০ সালে বিয়ের পর দুই সন্তানের জন্ম হলেও ২০১৬ সাল থেকে আলাদা থাকতে শুরু করেন এই দম্পতি। পেশায় আইনজীবী স্বামী নিজের আইনি জ্ঞানকে প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। স্ত্রীর আইনজীবীর দাবি অনুযায়ী, স্বামী তার স্ত্রী, শ্বশুরবাড়ি এবং এমনকি স্ত্রীর আইনজীবীর বিরুদ্ধেও ৮০টির বেশি মামলা দায়ের করেছিলেন। অন্যদিকে, স্বামীর অভিযোগ ছিল যে স্ত্রীর দায়ের করা গার্হস্থ্য হিংসার মামলায় তাকে জেল খাটতে হয়েছে, যা তার সামাজিক ও পেশাগত সম্মান ক্ষুণ্ণ করেছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও স্বামীর ভূমিকা
আদালত লক্ষ্য করেছে যে, স্বামী বিভিন্ন কো ম্পা নির ডিরেক্টর পদে আসীন থাকলেও আর্থিক দায়বদ্ধতা এড়াতে সেই তথ্য গোপন করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি ফ্যামিলি কোর্ট বা হাই কোর্টের খোরপোশ সংক্রান্ত নির্দেশও তিনি পালন করেননি। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, স্বামীর দায়ের করা অসংখ্য মামলা আদালতের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং এগুলো মূলত প্রতিহিংসামূলক। আদালত আরও মন্তব্য করে যে, শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি স্বামীর যে নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব রয়েছে, তা থেকে তিনি কোনোভাবেই মুক্তি পেতে পারেন না।
সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় ও ক্ষতিপূরণ
দীর্ঘ ১০ বছরের এই তিক্ততা অবসানে আদালত কঠোর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
- আর্থিক জরিমানা ও খোরপোশ: আগামী এক বছরের মধ্যে স্বামীকে তার স্ত্রীকে ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্বামী ইতিমধ্যে ৪৫ লক্ষ টাকা দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
- মামলা প্রত্যাহার: স্ত্রী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে স্বামীর দায়ের করা সমস্ত এফআইআর, মামলা এবং পিটিশন বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- সন্তানদের হেফাজত: দুই ছেলের স্থায়ী কস্টডি বা হেফাজত দেওয়া হয়েছে মাকে। তবে বাবা হিসেবে সন্তানদের সাথে দেখা করার অধিকার বজায় রাখা হয়েছে।
- আবাসন সংক্রান্ত শর্ত: ৫ কোটি টাকা পাওয়ার শর্ত হিসেবে স্ত্রীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমানে তিনি মুম্বাইয়ের লোকান্দওয়ালায় তার শ্বশুরের যে ফ্ল্যাটে থাকছেন, সেটি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে খালি করে দিতে হবে।
এই রায়ের মাধ্যমে আদালত এটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আইনি মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে পারিবারিক দায়িত্ব থেকে পালানো আসাম্ভব এবং দীর্ঘস্থায়ী তিক্ততা জনিত বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
একঝলকে
- বিবাদের সময়কাল: প্রায় ১০ বছর ধরে আইনি লড়াই।
- মামলার সংখ্যা: স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর দায়ের করা মামলার সংখ্যা ৮০টির বেশি।
- আর্থিক নির্দেশ: স্ত্রীকে ৫ কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ।
- সন্তানদের দায়িত্ব: দুই ছেলের হেফাজত পেলেন মা।
- আদালতের অবস্থান: সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে বিচ্ছেদ কার্যকর ও সমস্ত মামলা বাতিল।
- শর্ত: ক্ষতিপূরণ পেতে হলে শ্বশুরের ফ্ল্যাট ছাড়তে হবে স্ত্রীকে।